ফেনীর মহিপালের বাতাস তখন উত্তাল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশে হাজারো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ঠিক তখনই মঞ্চে এলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট ক্ষোভ। দীর্ঘ ছমাস ধরে ধৈর্য ধরার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, রাজপথে ছাড় দেওয়ার দিন শেষ। সরকারের তরফ থেকে আর একটি আঘাতও সহ্য করা হবে না।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গত কয়েক দিনে ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার যদি ভেবে থাকে দমন-পীড়ন চালিয়ে বিরোধী মত দমন করা যাবে, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। দেশের যেকোনো প্রান্তে জোটের কোনো কর্মীর গায়ে হাত তোলা হলে কঠোর হাতে তার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এ সময় সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে হুংকার ছাড়েন এই তরুণ রাজনীতিক। তিনি বলেন, আঘাত আসলে তার পাল্টা জবাব আসবেই। আর সেই আঘাত মোকাবিলা করার জন্য বর্তমান সরকারকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর এই কঠোর হুঁশিয়ারিতে মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো মহিপাল এলাকা। উপস্থিত জনতাও স্লোগানে স্লোগানে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের দিকে আঙুল তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি এবং তাদের ঘনিয়ে থাকা সিন্ডিকেট চক্র দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দিয়েছে। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। আর সেই সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। অথচ এর দায় এড়াতে সরকার উল্টো বিরোধীদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংসদের ভেতরে এবং বাইরে একদলীয় আধিপত্য চলছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় এই চিফ হুইপ। তিনি বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেওয়া হয়েছে। একই কায়দায় রাজপথেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানানোর একমাত্র পথ হিসেবে এই লংমার্চ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার কারণে রাজপথের এই লড়াই ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা ছিল না বলে জানান তিনি।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী এই দীর্ঘ যাত্রায় সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। ফেনীর পথসভায় মানুষের উপচে পড়া স্রোত দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। জনসমুদ্রে পরিণত হওয়া এই জনপদ থেকে সরকারের টনক নড়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে এবং এই বঞ্চনার হিসাব একদিন দিতেই হবে বলে তিনি হুঁশিয়ার করেন।
গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও উঠে আসে তাঁর কণ্ঠে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর মানুষ একটি দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসহীন ও সুশাসিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। যেখানে কর্মসংস্থান হবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদে বাঁচবে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে একটি প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারেনি। উল্টো দেশ ধ্বংসের পথে হাঁটছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা বক্তব্য রাখেন। ১১ দলীয় ঐক্যের এই কর্মসূচিতে জোটের শীর্ষনেতাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সমাবেশে জোরালো বক্তব্য রাখেন। প্রত্যেকেই সরকারের বর্তমান কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করেন এবং রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দেন। নেতাদের কণ্ঠে ছিল সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই লংমার্চ ও পরবর্তী হুংকার দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার এই সংঘাতময় পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। রাজপথের এই শক্তি প্রদর্শন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

