প্রকৃতির চরম রুদ্ররূপের মুখোমুখি লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আছড়ে পড়া দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ধসে পড়েছে বহু বহুতল ভবন। ধুলোয় মিশে গেছে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন। এই কঠিন মানবিক সংকটের মুহূর্তে বৈরিতার দেয়াল ভেঙে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ভেনেজুয়েলাকে একটি ‘মহান বন্ধু’ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন কারাকাসকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সক্ষম। দেশটির এই কঠিন সময়ে মার্কিন প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক আবেগঘন কিন্তু জোরালো বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মানবিক সহায়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও ইতিবাচক বার্তা লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের বার্তা ও ওয়াশিংটনের প্রস্তুতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, “ভেনেজুয়েলার জোড়া ভূমিকম্প নিয়ে এ পর্যন্ত যেসব তথ্য ও চিত্র আমাদের হাতে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটা পরিষ্কার যে সেখানকার পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। হাজার হাজার মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে যেকোনো ধরনের লজিস্টিক, মেডিকেল এবং মানবিক সাহায্য করতে প্রস্তুত। আমরা কেবল ইচ্ছুকই নই, এই সংকট মোকাবিলায় আমরা সম্পূর্ণ সক্ষম। আমি ইতোমধ্যে আমাদের সব সরকারি সংস্থাকে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছি।”
বিবৃতির শেষ অংশে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা এই বিপদের দিনে আমাদের নতুন এবং মহান বন্ধুদের পাশে সর্বদা থাকব।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুই দেশের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দূতাবাসের তৎপরতা
শুধু ট্রাম্পের ঘোষণাই নয়, মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্দাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লান্দাও লিখেছেন, “আমরা ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সেখান থেকে প্রকৃত চাহিদার তালিকা পাওয়ার চেষ্টা চলছে। একটি সমন্বিত ও কার্যকর সহায়তা কার্যক্রম সংগঠিত করতে আমাদের টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।”
এদিকে কারাকাসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকেও একটি বিশেষ জরুরি বিবৃতি জারি করা হয়েছে। দূতাবাস জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর থেকে স্থানীয় পরিস্থিতি এবং ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। দুর্গত এলাকায় দ্রুত মার্কিন ত্রাণ টিম পৌঁছানোর জন্য তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করছেন।
৪০ সেকেন্ডের সেই যমজ আঘাত ও ইউএসজিএসের রিপোর্ট
ভেনেজুয়েলার স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথম কেঁপে ওঠে চারপাশ। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ রাস্তায় নামার আগেই আসে দ্বিতীয় ধাক্কাটি। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম কম্পনটির তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রা এবং দ্বিতীয়টির তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৫ মাত্রা।
ইউএসজিএসের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড। এই অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে জোড়া আঘাত আসায় ভবনগুলো নিজেদের সামলে নেওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশের উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা। উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় রাজধানী কারাকাসসহ এর আশপাশের শহরগুলোতে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। অনেক পুরনো এবং দুর্বল অবকাঠামোর ভবনগুলো এই কম্পন সহ্য করতে না পেরে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
কারাকাস ও কাতিয়া লা মারে ধ্বংসের চিত্র
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের জিওলোকেশন করা একাধিক ভিডিওতে পুরো ভেনেজুয়েলা জুড়ে ভবন ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানী কারাকাস এবং এর সংলগ্ন উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারে। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা কাতিয়া লা মার শহরের বেশ কয়েকটি বহুতল আবাসিক ভবন চোখের পলকে ধসে কোটি কোটি টন মাটির নিচে চাপা পড়েছে। সেখানে এখনো বহু মানুষের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, আতঙ্কিত বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের বুকে জড়িয়ে এবং পোষা প্রাণীসহ কোনো রকমে জীবন বাঁচাতে ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে আসছেন। ধুলোবালিতে অন্ধকার হয়ে যাওয়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বজনদের খোঁজে চিৎকার করছেন হাজারো মানুষ।
৩২টি মরদেহ উদ্ধার, ৭০০ মানুষের আর্তনাদ
ধসে পড়া ভবনগুলোর নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে রাতভর অভিযান চালিয়েছে উদ্ধারকর্মীরা। সেনা, পুলিশ এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী কারাকাসের বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
জীবিত উদ্ধার হওয়া অন্তত ৭০০ জনকে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের করিডোরগুলোতে এখন ঠাঁই নেই। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শহরের একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক কাজ না করায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে, কারণ সামান্য অসতর্কতায় ভেতরে আটকে থাকা জীবিত ব্যক্তিরা প্রাণ হারাতে পারেন।
‘যা কিছু আছে তা নিয়েই লড়ছি’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেল্লো বুধবার গভীর রাতে রাষ্ট্রায়ত্ব টেলিভিশনে দেশবাসীর উদ্দেশে এক জরুরি বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি দেশের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সবাইকে শান্ত থাকার এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
কাবেল্লো বলেন, “আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয়। তবে আমরা দমে যাইনি। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যা কিছু লজিস্টিকস আছে, সেসব নিয়েই আমরা এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে যেসব সহায়তার প্রস্তাব আসছে, সেগুলোকে তারা স্বাগত জানান। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোই ভেনেজুয়েলা সরকারের একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য।
একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন মানবিক কূটনীতি
ভেনেজুয়েলার এই মানবিক সংকটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দ্রুত সাড়া দেওয়াকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিগত বছরগুলোতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, তখন এই জোড়া ভূমিকম্প যেন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ তৈরি করে দিল।
লাতিন আমেরিকার রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘মহান বন্ধু’ সম্বোধন কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এর পেছনে রয়েছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন মানবিক কূটনীতির ছোঁয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সন্ধিক্ষণে মার্কিন সহায়তা যদি সত্যি কারাকাসের মাটিতে পৌঁছায়, তবে তা হবে সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তি।
আপাতত রাজনীতি ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানবতা। কারাকাসের পিচঢালা রাজপথে এখন শুধুই সাইরেনের শব্দ আর অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনা। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের জীবিত ফিরিয়ে আনার এই অসম লড়াইয়ে ভেনেজুয়েলার পাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বিশ্ববাসীকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলছে।

