রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের ঠিক পাশেই জ্বলে উঠেছিল আগুনের লেলিহান শিখা। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ দুর্ঘটনা মনে হলেও, সময় ও স্থান বিবেচনায় তা রূপ নিয়েছে গভীর এক রহস্যে। শুক্রবার রাতের এই অগ্নিকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান এই আকাশবন্দরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় এখন বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠগড়ায়।
যে কন্টেইনারটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তার ভেতরের পণ্যগুলো আগামীকালের রবিবারে নিলামে ওঠার কথা ছিল। ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে এমন একটি স্পর্শকাতর এলাকায় এই অগ্নিকাণ্ড স্রেফ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নাকি সুপরিকল্পিত কোনো অপরাধ, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। খোদ বিমানবন্দর প্রশাসনের ভেতরের একাধিক সূত্র এই অগ্নিসংযোগের পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে।
শনিবার সকাল থেকেই বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে দফায় দফায় জেরা। তদন্তকারী দল এই ঘটনার পেছনের সত্য উন্মোচনে কোনো খামখেয়ালিপনা করতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিএইচএল-এর বেশ কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মীসহ অন্তত পাঁচজনকে আটক করে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর এভিয়েশন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পুরো ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন।
সিসিটিভি ব্ল্যাকআউট ও তদন্তের জটিলতা
তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির এক অদ্ভুত খামখেয়ালিপনা। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেটের কাছে যখন ডিএইচএল-এর সেই নির্দিষ্ট কন্টেইনারে আগুন ধরে, সেই জায়গাটি ছিল সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির বাইরে। বিমানবন্দরের মতো অতি কেতাবি ও সংবেদনশীল একটি স্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কীভাবে ক্যামেরার আওতার বাইরে থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পেন্টাগন বা আন্তর্জাতিক যেকোনো উচ্চ-নিরাপত্তা জোনের মতো কড়া প্রটোকল থাকার কথা বলা হলেও, বাস্তবে ৯ নম্বর গেটের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। কন্টেইনারের কাছাকাছি একটি বড় বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং কিছু ঝুলন্ত তার পাওয়া গেছে। ফলে প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল যে, হয়তো শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত।
কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পরীক্ষা করে ভিন্ন তথ্য পেয়েছেন। শর্ট সার্কিট হলে লাইনে বা খুঁটিতে যেসব চেনা পোড়া দাগ বা ট্রিপ করার লক্ষণ থাকে, তার কিছুই সেখানে মেলেনি। দুর্ঘটনার সময় ওই লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। এই আবিষ্কারের পর থেকে তদন্তকারীদের সন্দেহের তির এখন মানুষের তৈরি কোনো ষড়যন্ত্রের দিকেই নির্দেশ করছে।
নিষিদ্ধ এলাকায় সিগারেটের টুকরো ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন
রহস্যের জট আরও পাকিয়ে তুলেছে ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি আধপোড়া সিগারেটের ফিল্টার বা অবশিষ্টাংশ। বিমানবন্দরের এই কার্গো ভিলেজ বা কুরিয়ার অপারেশন এলাকাটি সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত এবং কঠোরভাবে সংরক্ষিত জোন হিসেবে ঘোষিত। সেখানে কারা ধূমপান করছিল এবং কীভাবে এই ফিল্টারগুলো সেখানে এলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বলন্ত সিগারেট থেকে যদি কোনো প্লাস্টিক বা কাপড়ে আগুন লাগে, তবে তা ছড়াতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। ধোঁয়া তৈরি হয় প্রথমে, তারপর ধীরে ধীরে তা শিখায় রূপ নেয়। কিন্তু সংগৃহীত কিছু দূরবর্তী ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কন্টেইনারের আগুনটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তীব্র রূপ ধারণ করেছে এবং চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কোনো দাহ্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত হতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগুন লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে এবং আগুন লাগার কালীন সময়ে ডিএইচএল-এর এক কর্মী ওই কন্টেইনারের খুব কাছেই অবস্থান করছিলেন।
এক রহস্যময় প্রত্যক্ষদর্শী ও নিলামের যোগসূত্র
ফুটেজে ওই কর্মীকে বেশ আরামদায়ক ভঙ্গিতে সেখানে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। কন্টেইনার থেকে যখন প্রথম আগুনের ফুলকি ও ধোঁয়া বের হতে শুরু করে, তখন তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চিৎকার বা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেননি। বেশ কিছু সময় তিনি স্রেফ দাঁড়িয়ে সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এরপর তিনি অলস ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে অন্যদের বিষয়টি জানান।
এই কর্মীর এমন অস্বাভাবিক ও শীতল আচরণ তদন্তকারীদের মনে বড় ধরনের সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ কোনো মানুষ আগুন দেখলে যে ধরনের আতঙ্ক বা তাড়াহুড়ো দেখায়, তার মধ্যে তার কিছুই ছিল না। তাকেও বর্তমানে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি কোনো পক্ষের হয়ে সেখানে নজর রাখছিলেন কিনা, তা জানার চেষ্টা চলছে।
এদিকে কন্টেইনারের ভেতরে থাকা মালের বিবরণী দেখে কপালে ভাঁজ পড়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। আগুনে পুড়ে যাওয়া কন্টেইনারটিতে বিপুল পরিমাণ কাপড়ের রোল, আন্তর্জাতিক মানের কাগজজাত পণ্য, মূল্যবান রাবার ও উচ্চ মূল্যের প্লাস্টিক সামগ্রী সংরক্ষিত ছিল। এসব পণ্যের আমদানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে কর ফাঁকি বা অন্য কোনো আইনি জটিলতার কারণে পণ্যগুলো খালাস করেননি।
বছরের পর বছর জমে থাকা অনিয়ম ও পুরনো ক্ষত
নিয়ম অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব পরিত্যক্ত বা জব্দকৃত পণ্য সরকারি রাজস্ব আদায়ের অংশ হিসেবে নিলামে তোলা হয়। রবিবারের সেই নিলামের তালিকায় এই কন্টেইনারের মালামালগুলোও ছিল। কাস্টমসের একটি বড় অংশ মনে করছে, নিলামের তালিকায় থাকা এই পণ্যের মালিকানা বা ভেতরের কোনো অবৈধ পণ্যের অস্তিত্ব গোপন করতেই এই আগুন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। এই একই প্রতিষ্ঠানের মালামাল রাখার স্থানে বারবার কেন আগুন লাগে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। এর আগে গত বছরের ১৮ অক্টোবর এই কার্গো ভিলেজেই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শত শত কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
আগের সেই বড় দুর্ঘটনার পর সিভিল এভিয়েশন ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বড় বড় আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছিল। কার্গো এলাকার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম বসানো এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট সচল করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন এই ঘটনা প্রমাণ করল যে, বিগত এক বছরে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তনই সেখানে আসেনি।
নিরাপত্তা গলদ নিয়ে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ক্ষোভ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের এই কার্গো এলাকাটি মূলত কিছু সিন্ডিকেটের চারণভূমি। এখানে মালামাল চুরি, চোরাচালান আর অনিয়ম ঢাকতে প্রায়শই নানা ধরনের ‘দুর্ঘটনা’ ঘটানো হয়। আগের আগুনের তদন্ত রিপোর্টও কখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে দায়মুক্তির এই সংস্কৃতির কারণেই বারবার দেশের প্রধান বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ অত্যন্ত সতর্ক ও পেশাদার মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমরা কোনো সম্ভাবনাকেই হালকাভাবে নিচ্ছি না। আগুনের প্রকৃত উৎস এবং এর পেছনের কারণ উদ্ঘাটনে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।”
গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ আরও যোগ করেন, “এটি স্রেফ একটি দুর্ঘটনা হতে পারে, আবার এর পেছনে সুদূরপ্রসারী কোনো নাশকতা বা স্বার্থান্বেষী মহলের হাত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি। বিমানবন্দরের সার্বিক ফ্লাইট অপারেশন অবশ্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কার্গো এলাকার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা যাওয়ার শঙ্কা
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে বারবার আগুন লাগার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট পাঠানোর জন্য কারিগরি ও নিরাপত্তা মান উন্নয়নের চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার মানদণ্ড কেবল রানওয়ে বা টার্মিনালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। কার্গো এবং কুরিয়ার জোন যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক মালামাল ওঠানামা করে, সেখানকার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা এবং গভীর রাতে বহিরাগত বা অননুমোদিত ব্যক্তির যাতায়াত পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই উন্মুক্ত করে দেয়।
শনিবার বিকেল পর্যন্ত বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেট এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে। কাস্টমস ও ডিএইচএল-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রবিবারের যে নিলামের কথা ছিল, তা এই ঘটনার পর সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে বলে কাস্টমস হাউস সূত্রে জানা গেছে।
আগামী দিনের তদন্ত ও প্রত্যাশা
তদন্তের স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ দলও কন্টেইনারের ভেতরের ছাই ও পোড়া অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে দেখছে। তারা জানার চেষ্টা করছেন, কন্টেইনারের ভেতর এমন কোনো দাহ্য পদার্থ ছিল কিনা যা সাধারণ বাতাসে বা তাপে নিজে নিজেই জ্বলে উঠতে পারে। তবে নিলামের ঠিক আগের রাতের এই টাইমিং বা সময়জ্ঞানই সবাইকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।
দেশের মানুষের চোখ এখন এই তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকে। বারবার তদন্ত কমিটি গঠন আর ফাইল চাপা পড়ে থাকার যে চেনা সংস্কৃতি, তা থেকে এবার প্রশাসন বেরিয়ে আসবে বলেই আশা সাধারণ মানুষের। যদি এটি নাশকতা হয়ে থাকে, তবে তার পেছনের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা না গেলে, শাহজালালের কার্গো কন্টেইনারে আগুনের এই খেলা কোনোদিনই বন্ধ হবে না।

