দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হলো বাংলাদেশের। টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এবার হ্যাটট্রিকের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। কিন্তু ফাইনালে স্বাগতিক ভারতের কৌশলী ফুটবল আর নিজেদের রক্ষণভাগের একের পর এক ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে টাইগ্রেসদের। ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত জমজমাট ফাইনালে ১-৩ গোলে হেরে শিরোপা পুনরুদ্ধারের মিশন ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
এই হারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে আরও একবার ২০১৬ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতি ফিরে এলো। সেবারও ভারতের শিলিগুড়িতে স্বাগতিকদের কাছে হেরেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বাংলাদেশের। মাঝের দুই আসরে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের করে নিলেও, ভারতের মাটিতে গিয়ে ভারতকে হারানোর কঠিন সমীকরণ এবার মেলাতে পারেনি পিটার বাটলারের শিষ্যরা।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই এবার ডিফেন্স আর গোলকিপিংয়ের দুর্বলতা ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। ফাইনালের মঞ্চেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতের আক্রমণভাগের দুর্দান্ত কোনো জাদুকরী ফুটবল নয়, বরং বাংলাদেশের নিজেদের ডি-বক্সের ভেতরের শিশুতোষ ভুলগুলোই ভারতকে গোল উপহার দিয়েছে। বিপরীতে ঋতুপর্ণা চাকমার একক লড়াই কেবল পরাজয়ের ব্যবধানই কমিয়েছে।
শুরু থেকেই ম্রিয়মাণ ডিফেন্স ও গোলকিপিং
গত দুটি সাফ ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল অপরাজিত থেকে। প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার যে চেনা ছন্দ, তা এবার গোয়ার মাঠে শুরু থেকেই অনুপস্থিত ছিল। গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও ভারতের কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। ফাইনালে এসেও সেই একই ভুল আর একই ফলের পুনরাবৃত্তি দেখল দেশের ফুটবলপ্রেমীরা।
ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের কৌশল নিয়ে টুর্নামেন্ট চলাকালেই নানামুখী গুঞ্জন ছিল। তবে ফাইনালে দলের মূল শক্তির জায়গা অর্থাৎ রক্ষণভাগ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ভারতের স্ট্রাইকারদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে ডিফেন্ডার আফিদা খন্দকার ও গোলরক্ষক মিলি আক্তারকে। ম্যাচের তিনটি গোলের পেছনেই ছিল এই দুজনের মারাত্মক সমন্বয়হীনতা।
খেলার প্রথম আধঘণ্টা দুই দলই সাবধানে পা বাড়াচ্ছিল। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিল না। তবে ৪২ মিনিটে প্রথমার্ধের ডেডলক ভেঙে ফেলে ভারত। গোলটি ভারতীয় ফরোয়ার্ড পিয়্যারী সাহার একক কৃতিত্বের চেয়ে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের ভুলে ভরা এক উপহার ছিল।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা ও ঋতুপর্ণার সমতা
একটি সাধারণ আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে পজিশন ছেড়ে পোস্ট থেকে বেশ সামনে বেরিয়ে আসেন মিলি। চতুর পিয়্যারী বক্সের ঠিক বাইরে বাংলাদেশের এক ডিফেন্ডারকে অনায়াসে কাটিয়ে নেন। এরপর মিলিকে উথাল-পাথাল অবস্থায় দেখে তার মাথার ওপর দিয়ে চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। মিলি পেছন ফিরে মরিয়া দৌড় দিলেও বলের নাগাল পাননি।
এক গোলে পিছিয়ে পড়েও বাংলাদেশ দমে যায়নি। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে (ইনজুরি টাইম) ম্যাচে ফেরে লাল-সবুজের দল। সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করে দলকে বাঁচানো ঋতুপর্ণা চাকমা আবারও ত্রাতা হয়ে আসেন। বক্সের কোণ থেকে তার নেওয়া এক দুর্দান্ত কোনাকুনি শট ভারতীয় গোলরক্ষককে পরাস্ত করলে ১-১ সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।
বিরতির পর গ্যালারি ভরা দর্শকদের চড়া চিৎকারে উজ্জীবিত হয়ে মাঠে নামে ভারত। অন্যদিকে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তের সেই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অর্ধেকের শুরুতেই, ঠিক ৪৯ মিনিটে কর্নার পায় ভারত। আর এই সেট পিস থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্বাগতিকদের হাতে চলে যায়।
কর্নার থেকে ভারতের লিড ও ছন্দহীন বাংলাদেশ
ভারতের নেওয়া নিখুঁত কর্নার কিকে বক্সের ভেতর লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত এক হেড করেন সানফিদা। সে সময় বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের কাউকেই তাকে বাধা দিতে বা ব্লক করতে দেখা যায়নি। গোলরক্ষক মিলি আক্তার শেষ মুহূর্তে বলের লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়লেও তার গ্লাভস ছুঁয়ে বল সাইড পোস্টে লেগে জালে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয়বার পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ আর সেই চেনা ছন্দে ফিরতে পারেনি। মাঝমাঠ থেকে ফরোয়ার্ডদের উদ্দেশ্যে কোনো কার্যকর পাস আসছিল না। পুরো দল বড্ড বেশি ঋতুপর্ণা-নির্ভর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভারতীয় ডিফেন্ডাররা ঋতুপর্ণাকে কড়া পাহারায় রাখায় তিনি এই অর্ধে কোনো বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করতে পারেননি।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার যত সময় ঘনিয়ে আসছিল, বাংলাদেশের ফুটবলারদের মধ্যে তত বেশি তাড়াহুড়ো আর ভুল পাসের প্রবণতা বাড়ছিল। আক্রমণ গোছানোর চেয়ে বল ক্লিয়ার করার দিকেই মনোযোগ ছিল বেশি। আর এই এলোমেলো ফুটবলের চূড়ান্ত সুযোগটি নেয় ভারত ম্যাচের ৮২ মিনিটে।
আফিদার ভুল ও ভারতের শিরোপা নিশ্চিত
ডি-বক্সের ভেতর একটি চলন্ত বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে বসেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার আফিদা খন্দকার। তার নেওয়া শটটি সরাসরি সামনে থাকা ভারতীয় ফরোয়ার্ডের পায়ে লেগে রিবাউন্ড হয়। বলটি তখন ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা আরেক স্ট্রাইকার কমের পায়ে চলে যায়।
এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেননি কম। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত শটে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। স্কোরলাইন ৩-১ হতেই গোয়ার ফতোরদা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যায়। বাকি সময়টুকুতে সাফের ট্রফি পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে কেবল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখাই ছিল ভারতের প্রধান লক্ষ্য।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ডাগআউট মাঠে নেমে আসে উল্লাসে। গত আসরে বাংলাদেশের কাছে ঘরের মাঠে হারার মধুর প্রতিশোধ নিল তারা নিজেদের চেনা আঙিনায়। অন্যদিকে মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নারী ফুটবলারকে। হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য গৌরব ছোঁয়ার খুব কাছ থেকে ফিরতে হলো তাদের।
কাঠগড়ায় দলের রণকৌশল ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
সাফ নারী ফুটবলে বাংলাদেশের এই পরাজয় দেশের নারী ফুটবলের অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যাকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং মাঠের বাইরে কোচিং স্টাফদের সঙ্গে দলের ভেতরের দূরত্বের যে গুঞ্জন, তা মাঠের পারফরম্যান্সে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
কোচ পিটার বাটলারের রক্ষণাত্মক কৌশল এবং রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের পজিশনিং নিয়ে ম্যাচ শেষেই সমালোচনা শুরু করেছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে এ ধরণের বেসিক বা মৌলিক ভুল কীভাবে দিনের পর দিন হতে পারে, তা নিয়ে বাফুফেকে (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) নতুন করে ভাবতে হবে।
তবে এই হারের পরও ঋতুপর্ণা চাকমা ও রুপনা চাকমাদের মতো তারকাদের একক লড়াই আগামী দিনের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। হ্যাটট্রিক শিরোপা না জেতা হলেও, এই দলটির বয়স ও সম্ভাবনা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে হলে এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত ভুলগুলো শুধরে নেওয়াই হবে টাইগ্রেসদের মূল চ্যালেঞ্জ।

