নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘমেয়াদী এক উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্পের প্রস্তাবে আপাতত সায় দেয়নি সরকার। দেশের বিভিন্ন উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নির্বাচন অফিস এবং সার্ভার স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বুধবার রাজধানীর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
প্রকল্পটি মূলত দেশের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা এবং নির্বাচনি সরঞ্জামাদির সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ এটি অনুমোদনের জন্য একনেক টেবিলে তুললেও প্রধানমন্ত্রীর কিছু মৌলিক পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার কারণে তা অনুমোদন পায়নি। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৯২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। এর আওতায় সারাদেশে একটি আঞ্চলিক অফিস, তিনটি জেলা অফিস এবং ৪৫টি উপজেলা নির্বাচন অফিস ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া মেট্রোপলিটন এলাকার থানা নির্বাচন অফিসগুলোর জন্য ১৬টি ফ্লোর-স্পেস কেনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল এতে।
২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির পর থেকে যে বিশাল জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে উঠেছে, সেটিকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সুরক্ষিত করা ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এর আগে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অধিকাংশ এলাকায় সার্ভার স্টেশন হলেও জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও নতুন প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের কারণে ৬৫টি এলাকায় এখনো নিজস্ব ভবন নেই। বর্তমান প্রস্তাবটির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করতে চেয়েছিল কমিশন।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন এক প্রশাসনিক দর্শনের কথা সভায় ব্যক্ত করেছেন। তিনি উপজেলা পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে সরকারি ভবন নির্মাণের সংস্কৃতি থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, প্রতিটি দপ্তরের জন্য আলাদা আলাদা ছোট ভবন নির্মাণ না করে একটি বড় ও সমন্বিত ‘মাল্টি-পারপাস’ ভবন নির্মাণ করাই শ্রেয়।
প্রধানমন্ত্রী সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “উপজেলার সব সরকারি অফিস একই ছাদের নিচে থাকা উচিত। সাধারণ মানুষকে যেন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ফাইল নিয়ে দৌড়াতে না হয়। এক ছাদের নিচে সব সেবা নিশ্চিত করলে যেমন জমির সাশ্রয় হবে, তেমনি জনগণের ভোগান্তিও কমবে।” প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার পর নির্বাচন কমিশনের ভবন নির্মাণের পৃথক প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ডেটা সেন্টার বা তথ্যভাণ্ডারের সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ডেটা সেন্টার কেন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে? কখনো শোনা যায় আইসিটি ভবনে, আবার কখনো নির্বাচন কমিশনে—এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে না রেখে একটি সুনির্দিষ্ট ও সর্বোচ্চ সুরক্ষিত জায়গায় সমন্বিতভাবে ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা প্রয়োজন।
প্রকল্প প্রস্তাবে ভূমি অধিগ্রহণ, আসবাবপত্র এবং আধুনিক কম্পিউটার সরঞ্জাম কেনার জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে ইভিএম মেশিন, ব্যালট বাক্স এবং অন্যান্য নির্বাচনি সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ওয়্যারহাউস বা অবকাঠামো তৈরির গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বশেষ রেট শিডিউল অনুযায়ী ব্যয় ধরায় প্রকল্পের প্রাক্কলিত খরচ আগের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সারাদেশের যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা এই প্রকল্পের তালিকায় ছিল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজীপুর সদর, লৌহজং, টুঙ্গিপাড়া, তারাকান্দা, শাহজাহানপুর, চাটখিল এবং কর্ণফুলীসহ মোট ৪৫টি এলাকা। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বেশ কয়েকটি মেট্রোপলিটন থানা অফিসও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ‘সমন্বিত ভবন’ ধারণার কারণে এই একক ভবন নির্মাণ পরিকল্পনাটি এখন বড় ধরনের সংস্কারের মুখে পড়ল।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সচিব ড. কাইয়ুম আরা বেগম জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প হওয়ায় এটি একনেকে তোলা হয়েছিল। মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়াতে এই পরিকাঠামো জরুরি হলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এখন হয়তো প্রকল্পের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় চাইছে সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণে এক নতুন মোড় ঘটাতে পারে। এতদিন প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর আলাদাভাবে জমি অধিগ্রহণ করে ভবন নির্মাণ করত, যা অনেক ক্ষেত্রে অপচয় ও সমন্বয়হীনতার জন্ম দিত। এখন থেকে ‘ওয়ান-স্টপ’ প্রশাসনিক ভবন নির্মিত হলে সাধারণ নাগরিকরা জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে সরকারি সেবা নিতে পারবেন।
তবে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোটার ডেটাবেজ ও এনআইডি সেবা যেহেতু একটি সংবেদনশীল বিষয়, তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘সমন্বিত ভবন’ ফরমুলায় নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ চাহিদাকে কীভাবে যুক্ত করা হয়। কমিশনকে হয়তো এখন প্রধানমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ মেনে নতুন করে সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরি করতে হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী কেবল ভবন নির্মাণের বিরোধী নন, বরং তিনি একটি টেকসই ও আধুনিক নাগরিক সেবা কাঠামোর পক্ষপাতী। বিশেষ করে ডেটা সেন্টারের মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোকে কেন বারবার স্থান পরিবর্তন বা ছড়িয়ে রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে তার প্রশ্ন ছিল খুবই জোরালো। তার নির্দেশনার মূল সুর ছিল—নিরাপত্তা হবে নিশ্ছিদ্র এবং সেবা হবে হয়রানিমুক্ত।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এখন যেহেতু এটি ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাই এর বাস্তবায়ন কাল কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। তবে প্রশাসনিক সংস্কারের এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে কেবল নির্বাচন কমিশন নয়, বরং সকল সরকারি দপ্তরের জন্যই এক ছাদের নিচে কাজ করার পরিবেশ তৈরি হবে। এতে সাশ্রয় হবে শত শত কোটি টাকার সরকারি জমি ও অর্থ।
একনেক সভায় এছাড়াও বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের এই ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ও দিকনির্দেশনামূলক অবস্থানই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিল যে, বিচ্ছিন্ন উন্নয়নের চেয়ে সমন্বিত ও জনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণই হবে আগামীর মূল অগ্রাধিকার।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নাগরিক সেবা সহজতর করা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের যে স্বপ্ন ইসি দেখেছিল, তা পূরণে এখন নতুন কোনো পথ খুঁজতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে হয়তো খুব শীঘ্রই একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের খসড়া তৈরি করা হবে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের জন্য থাকবে আলাদা সুরক্ষিত ফ্লোর এবং আধুনিক সার্ভার স্টেশন।
পরিশেষে, আজকের একনেক বৈঠক কেবল একটি প্রকল্প ফেরত দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবহারের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। জনগণের টাকা যেন কেবল ইট-পাথরের ভবন তৈরিতে ব্যয় না হয়ে সমন্বিত সেবায় ব্যবহৃত হয়, তারেক রহমানের এই দৃষ্টিভঙ্গি সচিবালয় পাড়ায় এখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

