দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে সবকটি মামলায় জামিন পেয়েছেন দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর থানায় দায়ের করা দুটি পৃথক হত্যা মামলায় আজ উচ্চ আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। এর ফলে সাবেক এই প্রধান বিচারপতির কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।
মঙ্গলবার সকালে বিচারপতি কে এম জাহিদ সরওয়ার কাজল ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে সাবেক এই বিচারপতির পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু এবং অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। শুনানির সময় আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শোনেন এবং জামিনের আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিগত জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনায় খায়রুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে হুকুমের আসামি করা হয়। আজকের আদেশের মাধ্যমে সেই সংঘাতকালীন দুটি বড় মামলার আইনি প্রক্রিয়া থেকে তিনি সাময়িক মুক্তি পেলেন।
এর আগে গত ২৮ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ খায়রুল হকের আরও ৫টি মামলায় জামিন বহাল রেখেছিলেন। সেসব মামলার মধ্যে ছিল যুবদলকর্মী হত্যা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রায় জালিয়াতি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলা। রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করলেও আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দিয়েছিলেন।
আইনি ধারাবাহিকতায় গত ৮ মার্চ এবং ১১ মার্চ হাইকোর্টের পৃথক দুটি বেঞ্চ তাঁকে পাঁচটি মামলায় রুল মঞ্জুর করে জামিন দিয়েছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই সময় জামিন স্থগিত চেয়ে বারবার আবেদন করায় তাঁর মুক্তি ঝুলে ছিল। এরই মধ্যে নিম্ন আদালতে নতুন করে আরও দুটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হলে কারামুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আজকের আদেশের পর সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির নিজস্ব বাসভবন থেকে বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে প্রথমে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়। এরপর একে একে তাঁর বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে, যার মধ্যে শাহবাগ থানায় দায়ের করা রায় জালিয়াতির মামলাটি দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছিল।
রায় জালিয়াতির মামলাটি করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। তাঁর অভিযোগে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায়ের মূল কপি পরিবর্তনের মাধ্যমে সংবিধানের বিশাল ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এবং বন্দর থানাতেও তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়।
সব মিলিয়ে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে পাঁচটি ফৌজদারি মামলা এবং দুদকের করা একটি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন ছিল। প্রতিটি মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর তিনি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালত তাঁর বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জামিনের রুল জারি করেছিলেন।
বিচারপতি খায়রুল হক বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত একটি নাম। ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর ২০১১ সালের ১৭ মে তিনি অবসরে যান। অবসর গ্রহণের পর তিনি তিন দফায় আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা নিয়েও তৎকালীন বিরোধী দলগুলো তীব্র আপত্তি তুলেছিল।
তাঁর প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন দেওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। ওই রায়ের মাধ্যমেই দেশে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই রায়ের রেশ ধরেই পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করেছে।
আজকের এই জামিন আদেশের পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন খায়রুল হকের আইনজীবীরা। তাঁরা দাবি করেন, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দীর্ঘ সময় ধরে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতিকে কারাগারে রাখা অনভিপ্রেত। আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তিনি মুক্তি পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে মামলাগুলো মোকাবিলা করবেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আজকের এই আদেশের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তারা জানিয়েছেন, আদালতের পূর্ণাঙ্গ আদেশের কপি পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মামলাতেই যেহেতু এখন তিনি জামিনপ্রাপ্ত, তাই মুক্তি পেতে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে আদেশের কপি পৌঁছানোই এখন সময়ের ব্যাপার।
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও বিচারিক রদবদল হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। তবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে রায় জালিয়াতি ও খুনের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াটি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে থাকবে।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিচারপতি খায়রুল হক কোথায় অবস্থান করবেন বা তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে সম্পর্কে পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। বর্তমানে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন বলে তাঁর আইনজীবীরা এর আগে আদালতকে জানিয়েছিলেন। জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর এই শারীরিক অবস্থাও একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে।
সাবেক এই বিচারপতির কারামুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে তাঁর অনুসারীরা এই আদেশকে ন্যায়বিচার হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে আন্দোলনের সময় স্বজন হারানো পরিবারগুলো এই মুক্তিতে হতাশা প্রকাশ করেছে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, জামিন মানে মামলা থেকে অব্যাহতি নয়, বরং বিচারের মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়া বজায় রেখেই এই মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই বিচারপতিকে নিয়ে আইনি লড়াই গত কয়েক মাস ধরে দেশের আদালত পাড়ায় প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল। আজকের পর সেই আলোচনার মোড় এখন তাঁর রাজনৈতিক ও পেশাদারী প্রভাবের পর্যালোচনার দিকে ঘুরে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন কেবল অপেক্ষা, কবে তিনি কারাফটক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

