রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এক আবেগঘন ও দাবি-দাওয়ায় মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো পুলিশের বার্ষিক কল্যাণ সভা। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত প্রত্যাশা আর পেশাগত সংকটের কথা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরলেন বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা। রোববার দুপুরে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সভার মূল কেন্দ্রে ছিল পুলিশের জন্য একটি ‘স্বতন্ত্র পে-স্কেল’ গঠনের দাবি। পুলিশ সদস্যরা যুক্তি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যদি আলাদা বেতন কাঠামো থাকতে পারে, তবে দিনরাত জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের জন্য কেন নয়? বিশেষ করে প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালনের কথা মাথায় রেখে এই দাবিকে সময়ের দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত ধৈর্য ও মনোযোগের সাথে পুলিশ সদস্যদের প্রতিটি কথা শোনেন। তিনি কেবল শোনেনইনি, বরং উপস্থিত কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, উত্থাপিত দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে। তার এই আশ্বাস অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হাজারো পুলিশ সদস্যের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
স্বতন্ত্র পে-স্কেলের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা পেশাগত ঝুঁকির বিষয়টিও জোরালোভাবে সামনে আনেন। সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে সবসময়। তাই একটি সম্মানজনক ‘ঝুঁকি ভাতা’ প্রবর্তনের দাবি জানানো হয়। সেই সঙ্গে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য ‘ওভারটাইম ভাতা’ চালুর অনুরোধও এসেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, পুলিশ বাহিনীর কাজের ধরন অন্য সব পেশা থেকে ভিন্ন। এখানে ছুটির কোনো নিশ্চয়তা নেই, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা। উৎসব কিংবা দুর্যোগ—সব সময় পুলিশকে রাজপথে থাকতে হয়। এই নিরলস পরিশ্রমের বিপরীতে বর্তমান বেতন কাঠামো পর্যাপ্ত নয় বলেই স্বতন্ত্র পে-স্কেলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
তদন্ত কাজে গতিশীলতা আনতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সীমাবদ্ধতার চিত্রও উঠে আসে সভায়। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যাতায়াত সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তারা অধিকাংশ মামলার তদন্ত করেন, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা নেই।
কামরুল হাসান তালুকদার প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, তদন্ত কাজে ব্যবহারের জন্য পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেল কেনার ক্ষেত্রে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হোক। একই সাথে মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচ মেটানোর জন্য বিশেষ বিলের ব্যবস্থা করলে তদন্তের গুণগত মান ও গতি দুই-ই বাড়বে। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে ব্যক্তিগত পকেট থেকে জ্বালানি খরচ চালানো এসআইদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সভায় তদন্ত ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়। বর্তমান বরাদ্দ বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে কর্মকর্তাদের অভিযোগ। তারা মনে করেন, তদন্ত ব্যয় বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষকে যেমন হয়রানির শিকার হতে হবে না, তেমনি কর্মকর্তাদের ওপর থেকেও আর্থিক চাপ কমবে। এতে পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
মানবিক ও সম্মানজনক বিদায়ের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন অধস্তনরা। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) একজন নারী কনস্টেবল কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদমর্যাদার সদস্যদের জন্য ‘অনারারি পদোন্নতি’র দাবি তোলেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে অবসরের আগে পদোন্নতির যে রেওয়াজ রয়েছে, তা পুলিশেও চালু করা হোক।
এই দাবির পেছনে আর্থিক সংশ্লেষের চেয়েও সামাজিক সম্মানের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একজন পুলিশ সদস্য যদি তার দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এক ধাপ উপরের র্যাংক নিয়ে অবসরে যেতে পারেন, তবে তা পরিবারের কাছে এবং সমাজে তার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী এই সংবেদনশীল বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্থবিরতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে কল্যাণ সভায়। একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, সারাদেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, থানা ভবন ও ব্যারাক নির্মাণের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের বসবাস ও দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে। এই বরাদ্দ পুনরায় চালুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সরকার চায় পুলিশ হবে জনবান্ধব এবং পেশাদার। আর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হলে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করা অপরিহার্য। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ বিষয়ে দ্রুত পর্যালোচনা করার নির্দেশনা দেন।
উল্লেখ্য, এর আগে সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বার্ষিক প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তাদের পদক পরিয়ে দেন। পুলিশের নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) স্টল পরিদর্শনকালেও তিনি বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের খোঁজখবর নেন।
উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারী শক্তি যেন পুলিশকে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের রক্তে রঞ্জিত এই মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বাহিনীকে জনগণের প্রকৃত সেবকে পরিণত হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, “জনগণ আপনাদের দিকে তাকিয়ে থাকে নিরাপত্তার আশায়। সেই আস্থার প্রতিদান আপনাদের দিতে হবে। আপনাদের দক্ষতা ও মানবিক আচরণই হবে নতুন বাংলাদেশের পুলিশের প্রধান বৈশিষ্ট্য।” ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
আগামীকাল সোমবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আরেকটি বিশেষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে পুলিশের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং আজকের উত্থাপিত দাবিগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, আজকের দিনটি পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করল।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পুলিশের মনোবল বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল বা ঝুঁকি ভাতা চালু হলে বাহিনীতে দুর্নীতি কমার পাশাপাশি কাজের আগ্রহ বাড়বে। তবে এই বিশাল আর্থিক সংস্থানের চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রাজারবাগের এই কল্যাণ সভা শেষে পুলিশ সদস্যদের চোখে-মুখে ছিল তৃপ্তির আভা। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে পারা এবং ইতিবাচক সাড়া পাওয়াকে তারা বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন। সাধারণ কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—সবারই প্রত্যাশা, এবার হয়তো তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নগুলো পূরণ হতে যাচ্ছে।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুরো রাজধানী এখন উৎসবমুখর। তবে এই উৎসবের আবহেও পুলিশ সদস্যরা ভুলে যাননি তাদের দায়িত্বের কথা। ‘জনগণই শক্তি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ পুলিশ বাহিনী গড়ার যে প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রী ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়নে পুলিশ সদস্যরা রাজপথে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার শপথ নিয়েছেন।
বিকেলের সূর্য যখন রাজারবাগের আকাশ থেকে হেলে পড়ছিল, তখন পুলিশ অডিটোরিয়ামের বাইরে সদস্যদের জটলায় আজকের আলোচনার নির্যাস নিয়ে চলছিল চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবার মনেই এক কথা—আশ্বাস তো মিলল, এবার দেখার পালা বাস্তবায়নের রূপরেখা। নতুন দিনের নতুন পুলিশ গড়ার এই যাত্রায় আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হলো।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুলিশের আধুনিকায়ন কেবল অস্ত্র বা প্রযুক্তিতে নয়, বরং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপরও নির্ভর করে। আজকের এই কল্যাণ সভা সেই উপলব্ধিরই একটি প্রতিফলন। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনীর সদস্যদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা হলে তারা আরও দৃঢ় চিত্তে রাষ্ট্রের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারবে।

