ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে আবারও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ। রোববার বিকেলে তিনি উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের দপ্তরে গিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদলের পর এটি ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়।
পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সিদ্ধান্তটি নিতান্তই ব্যক্তিগত। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর তিনি কিছুটা বিরতি নিতে চান। তবে হঠাৎ করে কেন এই সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে। তিনি স্পষ্ট করেই জানান, বর্তমানে তিনি কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকতে আগ্রহী নন এবং কিছুকাল বিশ্রামে কাটাতে চান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হতে পারে। তবে পরবর্তী দায়িত্ব কে পাবেন, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, তার রেশ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও। সেই অস্থির সময়ে অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদকে গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২৮ আগস্ট তিনি শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ থেকে প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পান। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাকে বেশ চ্যালেঞ্জিং সময় পার করতে হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট আবারও বদলে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত দুই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এমন ব্যাপক রদবদলের মাঝেই প্রক্টরের এই প্রস্থান তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের দায়িত্ব পালনের সময়টি ছিল বেশ সংবেদনশীল। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। তবে গত কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক টানাপোড়েন এবং নতুন নীতিমালার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সমন্বয়হীনতার কথা শোনা যাচ্ছিল। যদিও তিনি সরাসরি কোনো অভিযোগ তোলেননি, তবে ব্যক্তিগত কারণের আড়ালে প্রশাসনিক চাপ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রক্টর কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, বরং তিনি ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলের সময় এই পদের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। অধ্যাপক আহমদের বিদায়ে এখন শূন্যতা তৈরি হলো সেই স্পর্শকাতর স্থানে। এখন দেখার বিষয়, নতুন করে কার ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। তবে তারা চান এমন একজনকে প্রক্টর হিসেবে দেখতে, যিনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন এবং ক্যাম্পাসের পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখবেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দফায় দফায় অস্থিরতার পর শিক্ষার্থীরা এখন স্থিতিশীল একটি পরিবেশের প্রত্যাশা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ বরাবরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করে। নতুন সরকার আসার পর প্রশাসনের সর্বস্তরে নতুন লোক নিয়োগের যে রেওয়াজ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের, সাইফুদ্দীন আহমদের পদত্যাগ তারই একটি অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে বারবারই এটিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই অভিহিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন পরবর্তী প্রক্টর নিয়োগের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সহনশীল কাউকে এই পদে বসাতে চায় প্রশাসন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তত দিন পর্যন্ত প্রক্টর দপ্তরের রুটিন কাজগুলো কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি।
অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের এই প্রস্থান কি শুধুই ব্যক্তিগত ক্লান্তির বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে প্রশাসনের অদৃশ্য কোনো সংকেত ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠের প্রশাসনিক আমূল পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আরও এক ধাপ পূর্ণতা পেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজ এখন এক নতুন সূচনার অপেক্ষায়।
ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। তবে প্রক্টর দপ্তরের মতো একটি সক্রিয় বিভাগের প্রধানহীনতা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকে। উপাচার্য ওবায়দুল ইসলাম আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই শূন্যতা দ্রুতই পূরণ করা হবে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ গতিপথ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, দ্রুতই একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষককে প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সামনের দিনগুলোতে ক্যাম্পাস রাজনীতির যে নতুন রূপরেখা তৈরি হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রক্টরের ভূমিকা হবে অপরিসীম। অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের বিদায়ে যে অধ্যায়টি শেষ হলো, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম এক উত্তাল সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
বিকেলের দিকে প্রক্টর অফিস থেকে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে বিদায় নেন অধ্যাপক আহমদ। তার এই নীরবে সরে যাওয়া যেমন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, তেমনি রেখে গেছে ভবিষ্যতের জন্য নতুন কিছু সমীকরণ। বিশ্ববিদ্যালয় এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়, যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার ও শিক্ষার মানোন্নয়নই হবে মূল লক্ষ্য।

