দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর প্রতি হারানো আস্থা পুনর্গঠন করাকে বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কার এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই কঠিন যাত্রায় পুলিশকে জনগণের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আগামীকাল ১০ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া চার দিনব্যাপী ‘জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেড় দশকের বেশি সময় পর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের অধীনে এবারের পুলিশ সপ্তাহ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর এবং ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জননিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। নাগরিকদের মনে যদি ভয় কাজ করে বা ঘরের বাইরে বের হতে গিয়ে যদি তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে জাতীয় অগ্রগতির কোনো লক্ষ্যই সফল হওয়া সম্ভব নয়।
তারেক রহমান বলেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অপরাধ প্রতিরোধ এবং জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ বাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই দায়িত্ব পালন তখনই সহজ হয়, যখন বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনগণের একটি গভীর বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পুলিশকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন মানুষ বিপদে পড়লে সবার আগে তাদের কাছেই ভরসা পায়।
দীর্ঘ সময় পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসায় জনমনে যে স্বস্তি এসেছে, সেটিকে স্থায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন সরকারপ্রধান। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে গুম, অপহরণ আর ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করেছে। এখন তারা এমন এক সমাজ চায় যেখানে অনাচার কিংবা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ভয় থাকবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আমরা এখন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে। যেখানে জানমালের নিরাপত্তা থাকবে প্রশ্নাতীত। আর এই কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ বজায় রাখতে হলে পুলিশ বাহিনীকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার সাথে কাজ করতে হবে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সঠিক পরিবেশ পেলে তারা যে দক্ষতায় সক্ষম, তা প্রমাণিত হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি বলেন, শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় নয়, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের পুলিশ বাহিনী বাংলাদেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করেছে। তবে পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
সরকার মনে করে, পুলিশের উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি জননিরাপত্তার একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি স্থিতিশীল না থাকে, তবে দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই পুলিশ বাহিনীকে আরও গতিশীল ও প্রযুক্তিবান্ধব করার পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার।
দেশের বর্তমান সামাজিক অস্থিরতা ও নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির মতো ঘটনা, কিশোর গ্যাং কালচার এবং মাদকের মরণব্যাধি থেকে সমাজকে বাঁচাতে পুলিশকে ঢেলে সাজানোর কথা বলেন তিনি। তার মতে, গণতান্ত্রিক যাত্রাকে মসৃণ রাখতে হলে সমাজ থেকে এসব অস্থিরতা দূর করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই। একটি পেশাদার ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনীই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার রক্ষাকবচ।
আসন্ন পুলিশ সপ্তাহ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রত্যাশা করেন, এই সপ্তাহটি হবে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য নিজেদের ভুলভ্রান্তি শুধরে নিয়ে জনগণের প্রকৃত সেবক হওয়ার শপথ নেওয়ার একটি মুহূর্ত। জননিরাপত্তার স্বার্থে সরকার পুলিশের পাশে আছে এবং থাকবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ যদি আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে পারে এবং আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে, তবেই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তারা স্থায়ী জায়গা করে নেবে। একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে পুলিশের এই পরিবর্তিত এবং ইতিবাচক ভূমিকা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি।

