উৎসবের আমেজ আর বাণিজ্যিক ব্যস্ততার মাঝে সমন্বয় ঘটিয়ে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের দোকানপাট ও বিপণিবিতান খোলা রাখার সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী মঙ্গলবার (১২ মে) থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা এখন থেকে সন্ধ্যা ৭টার পরিবর্তে রাত ১০টা পর্যন্ত তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে পাঠানো এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা, যারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমিত সময়ের কারণে কেনাকাটায় হিমশিম খাচ্ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৪ মে, যখন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেয়। সেখানে তারা ঈদুল আজহার আগ পর্যন্ত কেনাকাটার সুবিধার্থে দোকানপাট রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনকে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করেন। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ১২ মে থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত রাত ১০টা পর্যন্ত বেচাকেনা চালানো যাবে।
তবে এই অনুমতির সঙ্গে একটি কঠোর শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কোনোভাবেই দোকান বা বিপণিবিতানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা করা যাবে না। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে যে গভীর জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। এই প্রেক্ষাপটে গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সীমা এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব ধরনের বিপণিবিতান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা পরদিন থেকেই কার্যকর হয়। পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ায় তাদের অনুরোধে সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে ৭টা করা হয়েছিল।
এখন রাত ১০টা পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির ফলে ঈদের বাজারে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকার গাউছিয়া মার্কেটের একজন ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, “সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে গিয়ে আমরা কাস্টমার পাচ্ছিলাম না। দিনে প্রচণ্ড গরমের কারণে মানুষ রাতে বের হতে পছন্দ করে। এই তিন ঘণ্টা সময় আমাদের জন্য আশীর্বাদ।”
তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চ্যালেঞ্জটি এখনো কাটেনি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো জানিয়েছে, রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকলেও লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি কমাতে আলোকসজ্জার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যারা নিয়ম অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎসবের অর্থনীতি সচল রাখা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকে ব্যবসায়ীদের লোকসান কমানো দরকার, অন্যদিকে জ্বালানি রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ যে তারা আমাদের দুঃখ বুঝতে পেরেছে। আমরা আমাদের সব সদস্যকে নির্দেশনা দিয়েছি যেন কোনো অবস্থাতেই শর্ত লঙ্ঘন না করা হয়। আলোকসজ্জা ছাড়াই আমরা এবার পবিত্র ঈদুল আজহার বাজার পরিচালনা করব।”
বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উন্নয়নশীল দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃচ্ছ্রসাধন এবং অপচয় রোধের যে ডাক দিয়েছিলেন, বিপণিবিতানের নতুন সময়সূচী সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।
ঈদের বাজারে সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে চাকুরিজীবীরা অফিস শেষ করে কেনাকাটা করার জন্য এই সময়ের ওপর নির্ভর করেন। সময়সীমা বৃদ্ধির ফলে এখন হুড়োহুড়ি কমবে এবং ব্যবসায়ীরাও বেশি মানুষের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন।
রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল ঘুরে দেখা গেছে, ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সময়ের প্রস্তুতির জন্য তাদের কর্মচারীদের রোস্টার ঠিক করছেন। অনেক জায়গাতেই এসি ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক বাতাস বা সীমিত পাখা ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নিজস্ব পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
সাধারণ ক্রেতারাও এই সিদ্ধান্তে খুশি। মিরপুর থেকে আসা এক ক্রেতা জানান, “রোজা বা ঈদের আগে তাড়াহুড়ো করে কেনাকাটা করা খুব কষ্টের। রাত ১০টা পর্যন্ত সময় পাওয়ায় এখন পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে বাজারে আসা যাবে।”
বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কেবল পশু কোরবানি নয়, পোশাক, মশলা এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হয় এই সময়ে। দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানো মানেই হলো এই চেইনটি সচল রাখা।
তবে কিছু ছোট ব্যবসায়ী রাত ১১টা পর্যন্ত দাবি পূরণ না হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বড় শপিং মলের তুলনায় ফুটপাথ বা ছোট গলিগুলোর দোকানগুলোতে বেচাকেনা শুরুই হয় দেরিতে। তবে বর্তমান সংকটের বাস্তবতায় ১০টা পর্যন্ত থাকাকেও তারা বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ১২ মে থেকে নিয়মিত মনিটরিং টিম কাজ করবে। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ট্রান্সফর্মারের ওপর চাপ কমাতে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তারা সজাগ থাকবে।
উৎসবের এই আবহে সরকারের এই নমনীয় মনোভাব সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক সংকটের এই অন্ধকার সময়ে ঈদ যেন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, সেই লক্ষ্যে ব্যবসায়ী ও সরকার এখন একযোগে কাজ করছে।
আসন্ন মঙ্গলবার থেকে যখন নতুন সময়সূচী কার্যকর হবে, তখন ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব বাজারেই এর প্রভাব পড়বে। সরকারের এই সাহসী সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির চাকাকে কতটা গতিশীল করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
নিরাপত্তার খাতিরে পুলিশ প্রশাসনকেও রাত ১০টা পর্যন্ত বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে। ছিনতাই বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিভিন্ন শপিং মল এলাকায় টহল বাড়ানো হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সীমাবদ্ধতার মাঝেও ঈদের কেনাকাটাকে উৎসবমুখর করতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন কেবল অপেক্ষা কার্যকর হওয়ার এবং ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণের। ঈদুল আজহা যেন সবার জন্য সমান আনন্দ বয়ে আনে, সেই প্রত্যাশাই এখন সর্বত্র।

