হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে উদ্ধারের লক্ষ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানটি শুরুর আগেই হোঁচট খেয়েছে। বাহ্যিকভাবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার দোহাই দেওয়া হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এক গভীর কূটনৈতিক টানাপোড়েন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই সামরিক অভিযানের জন্য সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সেই অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর এই কৌশলগত বাধার কারণেই ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে অভিযানটি স্থগিত করতে বাধ্য হন।
অথচ গত মঙ্গলবার যখন ট্রাম্প এই অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেন, তখন তার সুর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দাবি করেছিলেন, তেহরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতেই তিনি আপাতত সামরিক পথে হাঁটছেন না।
কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার বয়ান অনুযায়ী, বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল। ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করেন, তখন সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যায়। কারণ এই বিশাল অভিযানের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আগে কোনো আলাপই করা হয়নি।
ঘোষণার পরপরই ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে একটি জরুরি ফোনালাপ হয়। সূত্রের খবর অনুযায়ী, সেই আলাপে সৌদি যুবরাজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তারা এই মুহূর্তে কোনো নতুন আঞ্চলিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নন। বিশেষ করে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ইরানের রোষানলে পড়ার ঝুঁকি নিতে চায় না রিয়াদ।
সৌদি আরবের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে পাকিস্তান এই সংকট নিরসনে যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে, রিয়াদ তাতেই পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। তারা মনে করে, শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে কূটনীতিই এখন হরমুজ প্রণালির জট খোলার একমাত্র পথ। রিয়াদের এই অনড় অবস্থানের কাছে ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এক প্রকার গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস থেকে দাবি করা হয়েছিল যে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই অভিযানের ছক কষা হয়েছে। কিন্তু ওমানের এক কর্মকর্তার বক্তব্য এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ওমান সরকার এই অভিযানের ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানত না। মার্কিনিরা কাজ শুরু করার পর কেবল তথ্য বিনিময় হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির এই সংকটের মূলে রয়েছে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনা। ওই দিন ইরান সরকারের বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একযোগে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করে দেয়। ফলে আটকা পড়ে কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ।
ইরান এই অবরোধ দেওয়ার আগে হরমুজ প্রণালি সব দেশের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হলে বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রাণভোমরা তারা সচল হতে দেবে না। ট্রাম্প চেয়েছিলেন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই অবরোধ ভেঙে দিতে।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের পুরোনো সমীকরণগুলো এখন আর কাজ করছে না। সৌদি আরব এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের নির্দেশ পালনকারী কোনো দেশ নয়। তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে গত কয়েক বছরের শীতল সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর রিয়াদ আর পেছন ফিরতে চাইছে না।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অনেক কর্তাই মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ছিল একটি অপরিণামদর্শী পরিকল্পনা। মিত্রদের আকাশসীমা নিশ্চিত না করে এ ধরনের অভিযান ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প নিজের কূটনৈতিক দুর্বলতাই প্রকাশ করেছেন। এটি পেন্টাগনের জন্য এক ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে তাদের ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরানের সরকারি গণমাধ্যমগুলো বলছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, এটি কেবলই একটি সাময়িক বিরতি। আলোচনা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প আবারও হার্ডলাইনে ফিরে যেতে পারেন।
নৌপথটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চাপের মুখে রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতিও। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ওপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি বিশ্বনেতারাও চাইছেন একটি দ্রুত সমাধান।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন সবার নজরে। ইসলামাবাদ চেষ্টা করছে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে। সৌদি আরব কেন এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট। কারণ যুদ্ধ মানেই তেলের খনি আর অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি।
তবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি আশাহত হয়েছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু প্রশাসন চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের আড়ালে ইরানকে আরও কোণঠাসা করতে। সৌদি আরবের অসম্মতি ইসরায়েলি সামরিক পরিকল্পনাবিদদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা কতদিন চলবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার ওপর। ট্রাম্প যদি তার জেদ বজায় রেখে আবারও সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবেন, তবে তাকে আগে সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের আস্থায় নিতে হবে।
আপাতত হরমুজের নীল জলরাশি শান্ত থাকলেও এর গভীরে বইছে উত্তাল রাজনীতির ঢেউ। আকাশসীমা ব্যবহারের এই ছোট অনুমতি না মেলা যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বের জন্য কত বড় ধাক্কা, তা হোয়াইট হাউসের নীরবতাই বলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এখন ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে।
সামনের দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কি শেষ পর্যন্ত মুক্ত হতে পারবে, নাকি হরমুজ প্রণালি আরও বড় কোনো যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হবে—সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে। তবে ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আপাতত মার্কিন আর্কাইভে এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবেই জমা হলো।

