পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পটপরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার প্রাথমিক প্রবণতা বলছে, দুই দশকের দীর্ঘ লড়াই শেষে নবান্নের মসনদ দখলের পথে অভাবনীয় গতিতে এগিয়ে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া গণনায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে অনেকটা পেছনে ফেলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন গেরুয়া শিবিরের প্রার্থীরা।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সোমবার ২৯৩টি আসনের গণনা চলছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে, গত তিন মেয়াদের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে মাত্র ৯৫টি আসনে। বামপন্থি সিপিএম একটি এবং অন্যান্য প্রার্থীরা ৫টি আসনে লিড ধরে রেখেছেন। এই ফলাফল যদি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে তা হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পালাবদল।
রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে একটি আসন—দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় ভোটগ্রহণ বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে নির্বাচনী বিধিভঙ্গ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ ওঠায় আগামী ২১ মে পুনরায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সোমবারের গণনায় সবার চোখ বাকি ২৯৩টি আসনের দিকেই নিবদ্ধ ছিল।
সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ভোট গণনা। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং পরবর্তীতে ইভিএম-এর তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। শুরুর দিকে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি মনে হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরিয়ে হু হু করে বাড়তে থাকে বিজেপির লিড। দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিজেপির জয় এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে আগামী পাঁচ বছর পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। একদিকে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসন টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে ছিল ‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক দেওয়া বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার। প্রাথমিক প্রবণতা বলছে, পরিবর্তনের হাওয়ায় আপাতত ধরাশায়ী ঘাসফুল শিবির।
নির্বাচন কমিশন ভোট গণনা কেন্দ্রগুলোতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তিন স্তরের বেষ্টনীতে ঢেকে ফেলা হয়েছে গণনাকেন্দ্রের চারপাশ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা প্রতিটি কেন্দ্রে কড়া নজরদারি চালাচ্ছেন। বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কাউন্টিং এজেন্টদের কিউআর কোড সংবলিত বিশেষ কার্ড দেওয়া হয়েছে।
গণনাকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কমিশন। কেবল নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সীমিত পরিসরে যোগাযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—যাতে গণনার ফলাফল নিয়ে কোনো ধরনের কারচুপি বা উত্তেজনার সুযোগ তৈরি না হয়।
পুরো রাজ্যের নজর এখন ভবানীপুর কেন্দ্রের দিকে। সেখানে সরাসরি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরের এই লড়াই ব্যক্তিগত ইমেজের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সেখানেও শুভেন্দু অধিকারীর শক্ত অবস্থানের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তাত্পর্যপূর্ণভাবে নজর রয়েছে কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ওপর। কলকাতা বন্দর আসনে ফিরহাদ হাকিম এবং রাসবিহারীতে দেবাশীষ কুমারের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভাগ্যে কী আছে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এছাড়া নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ ও শশী পাঁজার মতো পরিচিত মুখদের লিড নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
বিজেপির তারকা প্রার্থীদের মধ্যেও জয়-পরাজয় নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। শিবপুর থেকে রুদ্রনীল ঘোষ এবং আসানসোল দক্ষিণে অগ্নিমিত্রা পাল লড়াইয়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। অর্জুন সিং ও তরুণজ্যোতি তিওয়ারির মতো নেতাদের ফলাফলও রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে একটি বিশেষ আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পানিহাটি কেন্দ্র। আর জি কর হাসপাতালে নৃশংসভাবে খুন হওয়া ছাত্রীর মা রত্না দেবনাথকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। তার লড়াইকে সাধারণ মানুষ কেবল রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে দেখেনি, বরং এটি ছিল এক বিচার চাওয়ার লড়াই। প্রাথমিক তথ্যে রত্না দেবনাথের এগিয়ে থাকার খবর অনেককেই চমকে দিয়েছে।
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোট গত নির্বাচনে খাতা খুলতে ব্যর্থ হলেও এবার তারা কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছে। বামপন্থি নেতাদের মধ্যে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের ওপর নজর থাকলেও ভোট বাক্সে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মুর্শিদাবাদ ও মালদহে অধীর চৌধুরী ও মৌসুম নূররা লড়াই করছেন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।
ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) নেতা নওশাদ সিদ্দিকীর ফলাফলও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে বিজেপি ভাগ বসাতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হলে বোঝা যাবে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়াকে বিজেপি সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। দুর্নীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবের মতো ইস্যুগুলো গ্রাম বাংলার সাধারণ ভোটারদের মনে গভীর দাগ কেটেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটাররা বিকল্পের খোঁজে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন।
বিজেপির এই অভাবনীয় উত্থান কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতারই ফল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। অনেক হেভিওয়েট নেতা নির্বাচনের আগেই দল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, যা তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘনঘন রাজ্য সফর কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে।
গণনা এখনো চলছে এবং বিকেলের দিকেই হয়তো চূড়ান্ত চিত্রটি পরিষ্কার হবে। তবে বর্তমান প্রবণতা যদি অটুট থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দল হিসেবে বিজেপি একাই সরকার গঠনের পথে হাঁটবে। আর তা হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটি হবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।
পুরো ভারতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এই ফল নিয়ে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই বাম ও আঞ্চলিক শক্তির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই দুর্গে গেরুয়া নিশান উড়ানোর যে স্বপ্ন বিজেপি দীর্ঘকাল ধরে দেখেছিল, আজ তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত ফল না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষই এখনো বিজয় মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে না।
কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি—সারা রাজ্যে এখন থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফলাফল ঘোষণার পর যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা অশান্তি ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য পুলিশ প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাজ্যের প্রতিটি বড় মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত বাহিনী। ড্রোন দিয়েও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
বিজেপির রাজ্য দপ্তরে এখন সাজ সাজ রব। দলের কর্মীরা একে অপরকে আবির মাখিয়ে আগাম জয় উদযাপন শুরু করেছেন। অন্যদিকে, তৃণমূল ভবনে এখনো নেমে আছে কবরের নিস্তব্ধতা। শীর্ষ নেতারা কেউ এখনো সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেননি। পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান নাকি আইনি পথে লড়াই—তৃণমূলের কৌশল এখন কী হবে, সেটাই দেখার বিষয়।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের প্রভাব ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে বাধ্য। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতার দুর্গে হানা দিতে পারা বিজেপির জন্য এক বিশাল মানসিক জয়। এটি প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধেও বিজেপি তাদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক লড়াই চালিয়ে জয়ী হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তনের যে ডাক দিয়েছিলেন, তা আজ ইভিএম-এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে। ১৯২টি আসনে বিজেপির এগিয়ে থাকা কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনার ইঙ্গিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উন্নয়ন’ নাকি মোদীর ‘বিকাশ’—বাঙালি ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলেছেন, তার উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
চূড়ান্ত গণনার ফলাফল আসার পর রাজ্যপালের ভূমিকা এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হবে পরবর্তী অধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন কেবল স্থায়িত্ব এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যাশা করছেন। নতুন যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটানো।
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক রদবদল উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণও বদলে যেতে পারে নতুন সরকারের আগমনে। আপাতত সবার চোখ টিভির পর্দা আর নিউজ পোর্টালগুলোর দিকে—কখন আসে সেই চূড়ান্ত ঘোষণা।

