দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভেস্তে গেল ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত সেই বহুপাক্ষিক আলোচনার সম্ভাবনা। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার রাতে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প সরাসরি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দীর্ঘ ভ্রমণে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কোনো অর্জন দেখছেন না তিনি।
হোয়াইট হাউসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যখন ইরানের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ত্যাগ করেছে, তখন মার্কিন প্রতিনিধিদের এই অনুপস্থিতি তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কের টানাপড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, “আমি এইমাত্র পাকিস্তানে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আমার প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছি।” তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।
ট্রাম্পের মতে, ইরানি প্রশাসনের ভেতরে এখন কে ক্ষমতার কেন্দ্রে আছেন বা কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তা নিয়ে খোদ তাদের নিজেদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। এই ‘নেতৃত্বের সংকট’ মার্কিন প্রশাসনকে আলোচনার টেবিল থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করেছে।
পরবর্তীতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থানের সপক্ষে আরও যুক্তি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে এখন সব সুযোগ রয়েছে, অথচ তাদের হাতে কিছুই নেই।”
ট্রাম্পের ভাষায়, ওয়াশিংটন এখন আলোচনার জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই তড়িঘড়ি করে কোনো সমঝোতায় যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না তার প্রশাসন। তিনি আরও যোগ করেন, “ইরান যদি সত্যিই কথা বলতে চায়, তবে তাদের কেবল একটি ফোন কল করলেই চলবে।”
হোয়াইট হাউস সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী এই দলের ইসলামাবাদ পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার বিমান ভ্রমণ করে পাকিস্তানে গিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল ছাড়া ফিরে আসাকে অর্থহীন মনে করছেন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেছেন, “কিছু না বলে শুধু বসে থাকার জন্য ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইট আর নয়। সব কার্ড এখন আমাদের হাতে। তারা চাইলে যেকোনো সময় আমাদের কল করতে পারে।” তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রশাসন এখন ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতিতে বিশ্বাসী।
এদিকে, মার্কিন প্রতিনিধিদের আসার আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছে। তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
পাকিস্তানি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বৈঠকগুলোকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বার্তায় জানান, আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে তার ‘অত্যন্ত উষ্ণ ও আন্তরিক’ মতবিনিময় হয়েছে।
শরিফ আরও উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি মধ্যস্থতার পথ তৈরি করা, যা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আপাতত ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি তার চিরাচরিত ‘ডিল-মেকিং’ কৌশলেরই অংশ। তিনি সম্ভবত ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে তাদের আরও নমনীয় হতে বাধ্য করতে চাইছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ওপরই তিনি বেশি জোর দিচ্ছেন।
ইসলামাবাদের জন্য এই সফর বাতিল হওয়াটা বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের অনমনীয় মনোভাব সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বহুমুখী চাপের সম্মুখীন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, দেশটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে ফাটল ধরে থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সম্ভবত ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে যে, জ্যারেড কুশনারের মতো ঝানু কূটনীতিককে এই মিশনে পাঠানোর অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং সময়ের সদ্ব্যবহার করার মানসিকতা শেষ মুহূর্তে পুরো সমীকরণ বদলে দিল।
এখন সবার চোখ তেহরানের দিকে। ট্রাম্পের এই ‘টেলিফোন কল’ করার আহ্বানে ইরান সাড়া দেয় কি না, নাকি তারা অন্য কোনো পথে হাঁটে, সেটাই দেখার বিষয়। তবে আপাতত ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পাড়ায় যে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর বার্তা কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যও একটি সংকেত। ট্রাম্প প্রশাসন যে কোনো শর্তহীন আলোচনায় বসতে রাজি নয় এবং তারা তাদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদে হতে যাওয়া এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকটি বাতিল হওয়া কেবল একটি সফরের সমাপ্তি নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে প্রথাগত কূটনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং শক্তির দাপটই এখন মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

