বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করল ইরান। বুধবার এই কৌশলগত জলসীমা থেকে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করেছে দেশটির নৌবাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
জব্দ করা জাহাজ দুটির মধ্যে একটি আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘এপামিনোন্দাস’ এবং অন্যটি পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেস্কা’। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই ঘটনা বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয়।
গ্রিসভিত্তিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘টেকনোমার শিপিং’ লাইবেরিয়ার জাহাজ এপামিনোন্দাস জব্দের বিষয়টি স্বীকার করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওমান উপকূল থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে থাকাকালীন ইরানি নৌবাহিনী জাহাজটিকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। তবে এতে জাহাজটির বড় কোনো ক্ষতি হয়নি এবং জাহাজে থাকা কর্মীদের কেউ হতাহত হননি।
অন্যদিকে, ‘এমএসসি ফ্রান্সেস্কা’ জাহাজটি বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি এমএসসি-র মালিকানাধীন। পানামার পতাকাবাহী এই জাহাজটির বর্তমান অবস্থা বা জব্দ হওয়া প্রসঙ্গে এমএসসি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি প্রদান করেনি। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, তাদের হেফাজতে বর্তমানে জাহাজটি রয়েছে।
ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, জাহাজ দুটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিচ্ছিল। এই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণেই সেগুলোকে আটক করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
বর্তমানে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালীটি সম্পূর্ণভাবে আইআরজিসি-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ২৮ তারিখ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান এই জলপথটি বন্ধ করে দেয়। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করা এই সরু পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে অসংখ্য বাণিজ্যিক কোম্পানি।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আগেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কোনো জাহাজ যদি এই প্রণালী অতিক্রম করতে চায়, তবে ক্যাপ্টেনকে অবশ্যই আইআরজিসি-র কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। এই বিধিনিষেধ না মানার কারণেই গতকালের এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীকে ইরান একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। যেহেতু বৈশ্বিক তেলের বাজারের একটি বিশাল অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, তাই এখানে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ইরানের এই পদক্ষেপ কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় ধরণের অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে।
এই এলাকায় টহলরত পশ্চিমা জোটের নৌবাহিনীগুলো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। তবে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জাহাজ মালিকদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) যায়, তার বিকল্প কোনো পথ আপাতত নেই। ফলে এই জলপথ দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকলে তার প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি কোণায় অনুভূত হবে। ইরানের এমন কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মোড় নিতে পারে।
আইআরজিসি-র সাম্প্রতিক এই তৎপরতা এটাই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব প্রমাণের জন্য তারা যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এর আগে বিভিন্ন সময় জাহাজ আটকের ঘটনা ঘটলেও বর্তমান সংঘাতের আবহে এই জাহাজ জব্দের ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আপাতত জাহাজ দুটি ইরানের কোনো বন্দরে নিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরান এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট নিরসন সম্ভব হবে।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দেখালেও পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। এই পথে যাতায়াতকারী অন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, তার উত্তর এখন কেবল তেহরানের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

