মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনীতির আঁচ এবার সরাসরি আছড়ে পড়েছে ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্থনীতি ফ্রান্সে। ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের আশঙ্কায় ফরাসি অর্থনীতির অন্তত ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি ইউরো ধুলোয় মিশে গেছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেসকিউর এই বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির খতিয়ান তুলে ধরে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এখন জরুরি ভিত্তিতে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ফরাসি অর্থমন্ত্রীর বরাতে এই উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আনা হয়েছে। আরটিএল রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেসকিউর স্পষ্ট করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ডের মুনাফার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে ফরাসি সরকারের ঋণের পেছনে ব্যয়ের মাত্রা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে, যা জাতীয় বাজেটে অতিরিক্ত ৩৬০ কোটি ইউরোর এক বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর নেতৃত্বাধীন সরকার এখন এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের পকেটে। সরকার ঘোষণা করেছে যে, এই মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে এবং জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ভর্তুকি বাজেট থেকেই সমন্বয় করা হবে। তবে এই সমন্বয় করতে গিয়ে অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ব্যয় স্থগিত করতে হচ্ছে প্যারিসকে।
মঙ্গলবার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর কিছু বিশেষ ব্যয় স্থগিত করার পরিকল্পনা পেশ করার কথা রয়েছে। যদিও অর্থমন্ত্রী অভয় দিয়ে বলেছেন যে, সরকার সরাসরি ঢালাও কোনো ‘বাজেট কাটছাঁট’ করবে না, তবে পরিস্থিতি যে অত্যন্ত সংবেদনশীল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে যারা পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিন যানবাহন ব্যবহার করেন, সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নতুন কিছু বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
ফ্রান্সের বর্তমান অর্থনৈতিক চিত্র এমনিতেই বেশ নড়বড়ে। ইউরোজোনের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি এখন অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে। এখন পর্যন্ত কেবল পরিবহন, মৎস্য ও কৃষি খাতের মতো অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতেই জরুরি জ্বালানি ভর্তুকি সীমিত রাখা হয়েছে। কারণ, সব খাতে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার মতো বিলাসিতা করার অবস্থায় এখন নেই এলিসি প্যালেস।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই অর্থনৈতিক মন্দা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশটির কট্টর ডানপন্থী দলগুলো দাবি তুলেছে যে, জ্বালানি তেলের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ ভ্যাট অবিলম্বে কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সরকারি হিসাব বলছে, ভ্যাট কমালে রাজস্বে যে ধস নামবে, তা সামলানো বর্তমান অবস্থায় অসম্ভব। অন্যদিকে, বামপন্থী দলগুলো তেলের দামের সর্বোচ্চ সীমা (প্রাইস ক্যাপ) নির্ধারণের দাবিতে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ফ্রান্সের এই ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে আরও বহুদূর যেতে পারে। একদিকে ঋণের বোঝা আর অন্যদিকে জ্বালানি তেলের অগ্নিমূল্য—এই দুই সাঁড়াশির চাপে ফরাসি অর্থনীতি এখন এক চরম অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। প্যারিসের নীতিনির্ধারকরা এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন ইসলামাবাদের সেই সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার দিকে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরলেই কেবল স্থিতিশীল হতে পারে ইউরোপের বাজার।

