বসন্তের উত্তপ্ত হাওয়ায় যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের আশা উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ওমান সাগরের লোনা জল আর যুদ্ধের দামামা সেই সম্ভাবনাকে ধূসর করে তুলেছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মুখে কোনো ধরনের আলোচনায় বসা তেহরানের জন্য কেবল ‘অগ্রহণযোগ্যই’ নয়, বরং এটি আত্মমর্যাদার পরিপন্থী। তার মতে, হোয়াইট হাউস একদিকে শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করে আলোচনার পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
মঙ্গলবার সকালে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন একটি ‘ভুল ধারণার’ ওপর ভিত্তি করে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করছে। গালিবাফের ভাষায়, ওয়াশিংটন আসলে আলোচনাকে একটি ‘আত্মসমর্পণের মঞ্চে’ রূপান্তর করতে চায়, যা ইরান কোনোভাবেই হতে দেবে না। তেহরানের এই কঠোর অবস্থান এমন এক সময়ে এলো যখন ওমান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলার খবর আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
গালিবাফের অভিযোগের আঙুল মূলত গত দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের দিকে। তিনি দাবি করেন, এই শান্তিকালীন সময়েও ওমান সাগরে ‘তোসকা’ নামক একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনী হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এটি কেবল একটি জাহাজের ওপর হামলা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন এবং বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির নগ্ন লঙ্ঘন। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র মুখে আলোচনার কথা বললেও সমুদ্রপথে কঠোর নৌ-অবরোধ বজায় রেখে ইরানের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে পিষ্ট করার চেষ্টা করছে।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ওমান সাগর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এখন আক্ষরিক অর্থেই বারুদের স্তূপ। গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরান হাত গুটিয়ে বসে নেই। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রয়োজনে ইরান নতুন কৌশল বা নতুন ‘তাস’ সামনে আনবে।” এই ‘নতুন তাস’ বলতে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতা বা হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তাদের নৌ-ইউনিটগুলো যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পূর্ণ প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন থেকে আসা বার্তাগুলোও বেশ আক্রমণাত্মক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই ইরানকে ‘চরম চাপের’ মুখে রাখার নীতি বজায় রেখেছেন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর রাখাই একমাত্র সমাধান। হোয়াইট হাউসের এই অনমনীয় মনোভাব তেহরানকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গালিবাফের মতে, হুমকির ছায়ায় যে আলোচনা হয়, তা মূলত একতরফা ডিকটেশন ছাড়া আর কিছুই নয়।
তেহরানের কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওমান সাগরে জাহাজে হামলার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে যাতে ইরানকে উসকে দেওয়া যায়। তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চাইছে ইরান আগে কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিক, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর অজুহাত দেবে। তবে তেহরান আপাতত অত্যন্ত সুকৌশলে পা ফেলছে। গালিবাফের বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, ইরান আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও শর্তহীনভাবে মাথা নোয়াতে রাজি নয়।
এদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। যদি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই বাকযুদ্ধ বাস্তবে কোনো বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। ইউরোপীয় দেশগুলো ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই উত্তেজনা কমানোর জন্য পর্দার আড়ালে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। কিন্তু গালিবাফের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ধাক্কা দিল।
সাবেক এই আইআরজিসি কমান্ডার এবং বর্তমান স্পিকার গালিবাফ ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার এই সরাসরি হুঁশিয়ারি মূলত ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সম্মতিক্রমেই এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, গত দুই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ ইরানকে শিখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা বিপজ্জনক। “আমরা আলোচনার টেবিলে আত্মসমর্পণ করতে আসিনি,”—গালিবাফের এই বাক্যটি এখন তেহরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগে বলা হচ্ছে, ইরান সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটগুলোকে অনিরাপদ করে তুলছে। তবে ইরান এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলছে, তাদের জাহাজগুলো কেবল নিজেদের জলসীমায় বা আন্তর্জাতিক বৈধ পথে যাতায়াত করছিল। ওমান সাগরের ঘটনাটি এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়ালকে আরও উঁচু করে দিল। ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে আলোচনার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, তা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
শেষ পর্যন্ত ইরান কোন ‘নতুন তাস’ সামনে আনে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান হয়তো তাদের অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো নতুন মহড়া চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিতে পারে। অথবা তারা ওমান সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি সীমাবদ্ধ করার জন্য নতুন কোনো কৌশল গ্রহণ করতে পারে। তবে যাই ঘটুক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট যে, ২০২৬ সালের এই বসন্ত বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটময়। গালিবাফের কঠোর বার্তা এবং ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান—এই দুই বিপরীত মেরুর সংঘর্ষে শেষ পর্যন্ত কূটনীতি নাকি যুদ্ধ জয়ী হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত আলোচনার টেবিল নয়, ওমান সাগরের রণক্ষেত্রই নির্ধারণ করছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের আগামীর ভাগ্য।

