ধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণী এক স্পর্শকাতর মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির ‘নুর খান’ বিমান বাহিনী ঘাঁটিতে অবতরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি বিশেষ সরকারি ও সামরিক উড়োজাহাজ। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, এই বিশাল বহরে মার্কিন প্রতিনিধি দলের জন্য অত্যাধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম, বিশেষ মোটরকেড এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সরঞ্জাম আনা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয়টি উড়োজাহাজের মধ্যে দুটি আজ সোমবার অবতরণ করেছে এবং বাকি চারটি গত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ধাপে ধাপে পাকিস্তানে এসে পৌঁছায়। ইসলামাবাদের প্রধান ভিআইপি প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত এই বিমান ঘাঁটি এখন কার্যত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা। হোয়াইট হাউসের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পৌঁছানোর আগেই এই বিশাল আয়োজন স্পষ্ট করছে যে, ওয়াশিংটন এই আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
এদিকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি সোমবার ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদামের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আলোচনার দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। নকভি আশ্বস্ত করেছেন যে, সফরকারী বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য ‘অভেদ্য নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা হয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মাঠপর্যায়ে পাকিস্তানের প্রস্তুতি তুঙ্গে থাকলেও তেহরানের দিক থেকে এখনো কোনো সবুজ সংকেত মেলেনি। ইরান এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। বরং তেহরানের গলায় শোনা যাচ্ছে চরম অবিশ্বাসের সুর। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আমরা কোনোভাবেই আশাবাদী নই, তবে আমরা বাস্তববাদী।”
বাঘাই আরও যোগ করেন যে, দীর্ঘদিনের শত্রুর বিষয়ে ‘হতাশাবাদী’ হওয়াটাই হবে বিজ্ঞের কাজ। তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী দল ইসলামাবাদে নামার অপেক্ষায়। ইরানের এই নেতিবাচক অবস্থান পুরো মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের আনাগোনা, অন্যদিকে ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের আকাশে এখন কূটনৈতিক যুদ্ধের কালো মেঘ।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি রাষ্ট্রদূত পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করলেও আলোচনার টেবিলে ফেরার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেননি। বৈঠকে ইসলামাবাদের প্রধান কমিশনার ও পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা পুরো শহরকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলেছেন, কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখনো ঝুলে আছে—ইরান কি শেষ পর্যন্ত টেবিলে আসবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় ইরান আলোচনায় বসলে তা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে। আবার আলোচনা থেকে পিছিয়ে গেলে যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়বে। এই উভয়সংকটের মাঝে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। ছয়টি মার্কিন উড়োজাহাজের অবতরণ কেবল সরঞ্জামের আগমন নয়, বরং এটি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বলেও মনে করছেন অনেকে।
এখন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি রাওয়ালপিন্ডির সেই বিমান ঘাঁটির দিকে। জেডি ভ্যান্সের পা রাখার পর ইরান তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদি এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

