দীর্ঘ এক দশকের লুকোচুরি আর আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে ধুলো দেওয়ার অবসান ঘটল। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাদক সম্রাট এবং ভয়ংকর ‘কিনাহান কার্টেল’-এর প্রধান ড্যানিয়েল কিনাহানকে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। দুবাই সরকারের পক্ষ থেকে আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউরোপের অন্তত চারটি দেশে ২০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করা এই অপরাধীকে ধরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আইরিশ পুলিশ এবং দুবাই পুলিশের দীর্ঘদিনের সমন্বিত প্রচেষ্টার পর গত ১৫ এপ্রিল তাকে আটক করা হয়। মূলত আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় এই অভিযান চালানো হয়েছে।
ড্যানিয়েল কিনাহানের অপরাধ জীবনের ইতিহাস কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। ২০১৬ সালে ডাবলিনের রিজেন্সি হোটেলে তাকে লক্ষ্য করে এক ভয়াবহ গুপ্তহত্যা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই যাত্রায় বেঁচে যাওয়ার পর তিনি আয়ারল্যান্ড ছেড়ে দুবাইয়ে পাড়ি জমান। মরুভূমির এই শহরটিকেই তিনি গত দশ বছর ধরে তার অপরাধ সাম্রাজ্যের অলিখিত সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন।
দুবাইয়ে অবস্থানকালে কিনাহান কেবল মাদকের কারবারই করেননি, বরং বৈধ ব্যবসার আড়ালে কয়েক মিলিয়ন ডলারের স্থাবর সম্পত্তির পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন। তার স্ত্রী কাওইমি রবিনসনের সাথে মিলে তিনি দুবাইয়ের বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিশাল বিনিয়োগ করেন। ২০২২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও আমিরাতের কর্পোরেট দুনিয়ায় তার প্রভাব ছিল অক্ষুণ্ণ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিনাহান এবং তার ছোট ভাই দুবাইয়ে খাদ্য, পোশাক এবং বস্ত্র ব্যবসার আড়ালে একাধিক ভুয়া কোম্পানি খুলেছিলেন। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় ছিল বক্সিং জগতের নেপথ্য কারিগর হিসেবে। বিশ্বখ্যাত বক্সার টাইসন ফুরির অন্যতম ঘনিষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে তিনি কোটি কোটি ডলারের চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি মার্কিন বক্সিং প্রমোশন কোম্পানি ‘টপ র্যাঙ্ক’ থেকেও তিনি পরামর্শক হিসেবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন।
২০১৭ সালে দুবাইয়ের বুর্জ আল-আরব হোটেলে কিনাহানের জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহোত্তর সংবর্ধনার কথা এখনও অনেকের মনে আছে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কুখ্যাত অপরাধ জগতের হোতারা এক হয়েছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, সেই আসরটি ছিল মূলত একটি ‘সুপার কার্টেল’ গঠনের সূচনা। এই চক্রটি একসময় ইউরোপের মোট কোকেন ব্যবসার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করত, যার বাজার মূল্য বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
কিনাহান কার্টেলের জাল কেবল মাদকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ড্যানিয়েলের বাবা এবং কার্টেলের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার কিনাহান সিনিয়রও দুবাইয়ে সক্রিয় ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি একটি অখ্যাত কোম্পানির মাধ্যমে মিশরীয় বিমান বাহিনীর কাছ থেকে ৯টি সামরিক পরিবহন বিমান কেনার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি হওয়ার পর থেকেই কিনাহানের দিন ফুরিয়ে আসছিল। এর আগে তার অন্যতম প্রধান সহযোগী শন ম্যাকগভর্নকেও গত বছর দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করে আয়ারল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার খোদ কার্টেল প্রধানের পতন ঘটল।
আয়ারল্যান্ডের বিচার ও স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাঘান এই গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, আইরিশ পুলিশ এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিনাহানকে আয়ারল্যান্ডে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টার পর আন্তর্জাতিক এই মাদক সম্রাটকে খাঁচায় বন্দি করা সম্ভব হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে ইউরোপীয় দেশগুলোতে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কিনাহানের গ্রেপ্তার বিশ্বজুড়ে সংগঠিত অপরাধ দমনে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

