পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও বন্ধ হয়ে গেল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’। বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পথটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের অবরোধ জারি করেছে তেহরান। শনিবার দুপুরে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর যৌথ সামরিক কমান্ড এক জরুরি বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা আবারও সম্পূর্ণভাবে সামরিক বাহিনীর হাতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং অনড় অবস্থানের কারণেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এক ঘোষণায় জানিয়েছিলেন, সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছিলেন যে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে চলাচল করতে পারবে। এই ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল।
তবে এই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ইরানের ঘোষণার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক কড়া বার্তা দেন। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান জলপথ খুলে দিলেও দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না। তিনি সাফ জানান, ওয়াশিংটনের সাথে চূড়ান্ত চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোতে কোনো জাহাজ ঢুকতে বা বের হতে পারবে না।
ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি তেহরানও। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এক বার্তায় হুঁশিয়ারি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে, তবে ইরানও হরমুজ প্রণালী বেশিদিন খোলা রাখবে না। ঘালিবাফের এই হুমকির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামরিক কমান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালীটি পুনরায় বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর আজকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পুরো প্রণালীর ব্যবস্থাপনা এখন থেকে আবারও পূর্বের কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকবে।” এই সিদ্ধান্তের ফলে পারস্য উপসাগরে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির বিপরীতে ইরান এখন হরমুজ প্রণালীকে তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো তাদের গন্তব্য নিয়ে নতুন করে ভাবছে। অনেক জাহাজ এখন গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ রয়েছে পরবর্তী নির্দেশের জন্য।
কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আগামী ২০ এপ্রিল পাকিস্তানে হতে যাওয়া সম্ভাব্য আলোচনার পরিবেশ এই ঘটনার পর কতটা বজায় থাকবে। একদিকে ট্রাম্পের ২২ এপ্রিলের ডেডলাইন, অন্যদিকে ইরানের এই পাল্টাপাল্টি অবরোধ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় কোনো যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
তেহরান বলছে, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত কিন্তু সেটি হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে। এই দুই শক্তির দ্বৈরথে এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালীর এই নতুন অবরোধ কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তাও বটে।
আপাতত হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। সমুদ্রের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারটি কবে নাগাদ আবার খুলে দেওয়া হবে, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যুদ্ধ নাকি সমঝোতা— কোন দিকে মোড় নেয় এই সংকট, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

