বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ফের নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানান দিল ইরান। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আয়োজিত আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর ১৫২তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে ইরানের প্রতিনিধি দলের প্রধান মানুচেহর মোত্তাকি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই কৌশলগত জলপথের পূর্ণ কর্তৃত্ব তেহরানের হাতেই রয়েছে।
আইপিইউ-এর নির্বাহী পরিষদের এই প্রভাবশালী সদস্য শুক্রবার সাধারণ সভায় দেওয়া ভাষণে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে মার্কিন ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংসদীয় সংস্থাগুলোকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মোত্তাকি তার বক্তব্যে গত দশ মাসের এক বিস্ফোরক খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ইরান গত এক বছরেরও কম সময়ে দুটি বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ এবং একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার শিকার হয়েছে। তার মতে, ইরানের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা এবং দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করার লক্ষ্যেই এসব ষড়যন্ত্র চালানো হয়েছিল। তবে জনগণের প্রতিরোধে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আল্টিমেটাম এবং ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করে মোত্তাকি বলেন, ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার নাম করে এক ধরনের ‘কৌশলগত ছলচাতুরি’র আশ্রয় নিয়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পাঁচ দফা বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেল আবিব পর্দার আড়ালে ভিন্ন পরিকল্পনা সাজিয়েছিল।
ইরানের এই শীর্ষ কর্মকর্তার অভিযোগ, গত বছর জুন মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পর্যবেক্ষণে থাকা তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমন্বয়ে পরিচালিত এই হামলাকে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানীসহ এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন বলে তিনি দাবি করেন।
পাল্টা হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোত্তাকি বলেন, জাতিসংঘের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার ইরানের রয়েছে। সেই অধিকার থেকেই ইরান পাল্টা আঘাত হেনেছিল মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের প্রধান শহর তেল আবিব ও হাইফায়। তার ভাষ্যমতে, তেহরানের সেই ১২ দিনের প্রচণ্ড আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরেই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির আবেদন করতে বাধ্য হয়।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে মোত্তাকির এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের একটি বিশাল অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার কথা বারংবার বলা হলেও, বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই মন্তব্য ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মোত্তাকি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সরকার এবং ইসরায়েলি প্রশাসন ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু সেই আগ্রাসন রুখে দিয়ে ইরান এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। আইপিইউ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইরানের এই বক্তব্য মূলত বিশ্ববাসীর কাছে তাদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের সপক্ষে জনমত গঠনের একটি চেষ্টা।
তুরস্কের এই অধিবেশনে ইরানের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি এবং এমন কড়া ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান কেবল সামরিকভাবেই নয়, বরং কূটনৈতিক টেবিলে ও বৈশ্বিক ফোরামেও সমানে লড়াই চালিয়ে যেতে চায়। তারা বোঝাতে চাইছে, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও চাপের কাছে তারা মাথা নত করবে না।
আগামী ২০ এপ্রিল পাকিস্তানে হতে যাওয়া সম্ভাব্য সংলাপের আগে মোত্তাকির এই বক্তব্য ওয়াশিংটনের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। একদিকে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা, অন্যদিকে তেহরানের এই অনড় সুর— সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান নাকি নতুন কোনো সংঘাত, তার উত্তর এখন সময়ের হাতেই বন্দি।

