মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ইরানকে এবার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ২২ এপ্রিল, বুধবারের মধ্যে তেহরানকে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে। অন্যথায়, বর্তমানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আর নবায়ন করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে রিপাবলিকান পার্টির একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ করে ওয়াশিংটনে ফিরছিলেন ট্রাম্প। ফেরার পথে তার সরকারি বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তিতে না আসে, তবে ওয়াশিংটন তার কঠোর অবস্থানে ফিরে যাবে।
সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ২২ এপ্রিলের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না। ট্রাম্পের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি বলেন, সম্ভবত আমি আর সময় বাড়াব না। তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যে মার্কিন অবরোধ চলছে, তা কোনো অবস্থাতেই শিথিল করা হবে না।
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক আল্টিমেটাম নয়, বরং তেহরানের জন্য একটি সরাসরি সতর্কবার্তা। তিনি যোগ করেন, যদি চুক্তি না হয়, তবে তাদের বন্দরগুলো অবরুদ্ধই থাকবে। এবং দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের আবারও ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করতে হতে পারে। ট্রাম্পের এই ‘বোমাবর্ষণ’ শব্দটির ব্যবহার আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটের মূলে রয়েছে তেহরানের পরমাণু প্রকল্প এবং বিতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। এই দুই ইস্যুতে মতবিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪০ দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গত ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, যা মূলত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ করে দেয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। যুদ্ধবিরতির তৃতীয় দিনে ইসলামাবাদের একটি অভিজাত হোটেলে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ম্যারাথন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টানা ২১ ঘণ্টার সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। মূলত তেহরান এবং ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থানই সেই সময় কোনো বড় ঘোষণা আসতে দেয়নি।
ইসলামাবাদে প্রথম দফার সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার উভয় পক্ষকেই আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানায়। স্বস্তির বিষয় ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই দ্বিতীয় দফায় সংলাপে বসতে রাজি হয় এবং ভেন্যু হিসেবে আবারও ইসলামাবাদের ওপরই আস্থা রাখে। আগামী ২০ এপ্রিল এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ২০ এপ্রিলের আলোচনার দুই দিন পরই ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০ তারিখের বৈঠকটিই হবে এই সংকটের চূড়ান্ত ভাগ্যবিধাতা। সেখানে যদি কোনো খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত না হয়, তবে ২২ এপ্রিলের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ট্রাম্পের প্রশাসন শুরু থেকেই ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতিতে বিশ্বাসী, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমানের বন্দর অবরোধেও।
গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ট্রাম্প ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলো অবরোধের নির্দেশ দেন। এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের কোনো জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় বের হতে পারছে না এবং বাইরে থেকে কোনো রসদও ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে, যা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান না এই আলোচনা অনন্তকাল ধরে চলুক। তিনি একটি দ্রুত এবং স্থায়ী সমাধান চাইছেন যা মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবে। অন্যদিকে, ইরান বারবার বলে আসছে যে তারা কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই তারা যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বের নজর ইসলামাবাদের দিকে। ২০ এপ্রিলের বৈঠকে পাকিস্তান কি পারবে দুই পক্ষকে একটি সাধারণ বিন্দুতে মেলাতে? নাকি ২২ এপ্রিলের পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আগুনের গোলা এবং মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যাবে? কূটনীতির এই দাবা খেলায় সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার এই সরাসরি হুমকির ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যদি বুধবারের মধ্যে কোনো ইতিবাচক খবর না আসে, তবে দীর্ঘ ৪০ দিনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো আবারও ফিরে আসতে পারে, যা কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আপাতত হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে তেহরানের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবাই এখন ২০ এপ্রিলের ওই টেবিলের দিকে তাকিয়ে। যেখানে নির্ধারিত হবে শান্তি, নাকি আবারও দীর্ঘস্থায়ী এক সংঘাত। সময়ের কাঁটা টিকটিক করে এগোচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ। ইরান কি ট্রাম্পের এই শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তিতে সই করবে, নাকি নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে আবারও যুদ্ধের পথে হাঁটবে— উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনেই।

