যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তার প্রশাসন অত্যন্ত ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে’ ইরান থেকে ইউরেনিয়াম বা ‘পারমাণবিক ধূলিকণা’ সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসবে। ফনিক্সে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, তেহরান এই প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
গতকাল অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফনিক্স শহরে রিপাবলিকান পার্টির সহযোগী সংগঠন ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’-এর একটি বিশাল সমাবেশে ট্রাম্প এই বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ইরান ইস্যুতে তার প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরেন। ট্রাম্প বলেন, “অনেকে প্রশ্ন করছেন আমরা কীভাবে ইরানের সেই নিউক্লিয়ার ডাস্ট (ইউরেনিয়াম) হাতে পাব? আমার উত্তর খুব সহজ—আমরা সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক এক্সকেভেটর বা খননযন্ত্র নিয়ে যাব এবং ইরানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তা সংগ্রহ করব।”
নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে খননযন্ত্রের বিশালত্বের বর্ণনা দিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, “এ কাজের জন্য আমাদের এমন শক্তিশালী এবং অতিকায় এক্সকেভেটর প্রয়োজন, যা আপনারা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবেন না। কিন্তু আমরা একা নই, আমরা ইরানের সঙ্গেই এই কাজ সম্পন্ন করব এবং খুব দ্রুতই সেই ইউরেনিয়াম দেশের মাটিতে (যুক্তরাষ্ট্রে) ফিরিয়ে আনব।”
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প প্রথম দাবি করেছিলেন যে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবি ওঠার পরপরই তেহরান থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ইরানের ইউরেনিয়াম কোথাও যাবে না এবং এটি হস্তান্তরের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
ইরানের এই সরাসরি প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও ট্রাম্প তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। ফনিক্সের সমাবেশে তার এই নতুন ঘোষণা আসলে তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি নাকি বাস্তব কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশুদ্ধ।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ পরিশুদ্ধতার খুব কাছাকাছি। ফলে এই মজুত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা এই ‘পারমাণবিক ঝুঁকি’ চিরতরে নির্মূল করতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা ইরানের মাটির নিচে বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় থাকা ইউরেনিয়াম খুঁড়ে বের করে আনার পরিকল্পনা করছে।
ট্রাম্পের এই বক্তৃতায় ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ের’ ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এটি কোনো সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি যৌথ কারিগরি উদ্যোগ হতে যাচ্ছে। তবে তেহরান যেভাবে বারবার এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—আসলে আলোচনার টেবিলে কী ঘটছে? বিশেষ করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে পরোক্ষ সংলাপ চলছে, সেখানে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়টি আদৌ অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘বিশাল এক্সকেভেটর’ তত্ত্ব হয়তো কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়। গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বিমান হামলার পর অনেক মজুত ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্প সম্ভবত সেই ধ্বংসাবশেষ বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ পরিষ্কার করার ছলে ইউরেনিয়াম কব্জা করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এদিকে তেহরান বলছে, তারা শুধুমাত্র তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চলছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা নিয়ে চলছে উত্তেজনা। ট্রাম্পের দাবি যদি সত্যি হয় এবং ইরান সত্যিই ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা।
তবে আপাতত ফনিক্সের সমাবেশে ট্রাম্পের এই ‘খননযন্ত্র’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ ইউরেনিয়াম সংগ্রহ’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও বিতর্ক দুই-ই বাড়ছে। ইরান শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে সাড়া দেবে নাকি সংঘাতের পথ বেছে নেবে, তা সময়ই বলে দেবে।

