মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আর কূটনৈতিক টানাপড়েন তুঙ্গে, ঠিক তখনই তেহরানকে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিল তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মিত্র চীন। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে এবং নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগচির সঙ্গে এক জরুরি টেলিফোনলাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই পরামর্শ দেন। এমন এক সময়ে এই ফোনালাপটি হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
আরাগচির সঙ্গে আলাপকালে ওয়াং ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার রয়েছে, তাকে অবশ্যই সম্মান জানানো উচিত। তবে একই সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি।”
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যার একদিকে চরম সংঘাত আর অন্যদিকে স্থায়ী শান্তি। তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা এখন যুদ্ধ এবং শান্তির ঠিক মাঝখানের একটি ধূসর এলাকায় অবস্থান করছি। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে শান্তিতে উত্তরণের প্রধান পথ হতে পারে হরমুজ প্রণালিকে সব ধরণের বাধার উর্ধ্বে রাখা।”
ওয়াং ই আরও স্পষ্ট করেছেন যে, চীন কেবল তেলের ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি দেখতে চায়। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য চীন তার পূর্ণ কূটনৈতিক সমর্থন দেবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তবে বেইজিংয়ের এই ‘বন্ধুসুলভ’ আহ্বানের জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে আব্বাস আরগচি ঠিক কী বলেছেন, তা ওই বিবৃতিতে খোলাসা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই মুহূর্তে চীনকে চটাতে চাইবে না, কারণ তাদের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় চীনের বাজারে।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং অবরোধের কারণে ইরানের তেল সরবরাহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছে যে, ইরানের কাছ থেকে তেল কিনলে চীনের ব্যাংকগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। এমন দ্বিমুখী চাপের মুখে চীনের এই আহ্বানকে অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবিসি এবং সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত এই জলপথ উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া, যা চীনের বিশাল অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটনের চোখ রাঙানি আর বেইজিংয়ের এই নরম সুরের আহ্বানের মধ্যে ইরান কোন পথ বেছে নেবে? তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কিছুটা নমনীয়তা দেখায়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে শীতল করার ক্ষেত্রে প্রথম বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে আজ শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনার ফলাফলের ওপর।

