ওয়াশিংটনের সাথে চলমান স্নায়ুযুদ্ধে এবার কৌশলী চাল চালল তেহরান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের মুখে যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইসলামাবাদে ব্যর্থ হওয়া প্রথম দফার আলোচনার রেশ ধরে ইরান এখন চাচ্ছে ইউরোপকে মধ্যস্থতাকারী বা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি সম্প্রতি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারো এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াদেফুলের সাথে দীর্ঘ আলাপ করেছেন। এছাড়া সৌদি আরব, ওমান ও কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথেও যোগাযোগ নিবিড় করেছে তেহরান। আরাগচির মূল লক্ষ্য হলো—ইসলামাবাদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে ইরান যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছিল, সেগুলোর যৌক্তিকতা ইউরোপের কাছে তুলে ধরা।
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মূলত ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে ইরান নীতি নির্ধারণ করছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, ইরানও এতদিন ইউরোপকে ওয়াশিংটনের ‘অন্ধ অনুসারী’ মনে করে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকায় তেহরান এখন সেই ফাটলকে কাজে লাগাতে চাইছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে প্রথম দফা আলোচনায় কোনো লিখিত সমঝোতা না হলেও তেহরান এই প্রক্রিয়াকে মৃত বলে মনে করে না। বরং ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে নমনীয় হতে বাধ্য করাই এখন ইরানের প্রধান কৌশল। ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলো বর্তমানে যে চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি—আর এই সুযোগটিই নিতে চায় ইরান।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে হোয়াইট হাউসের যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তাকে পুঁজি করতে চাইছে তেহরান। আব্বাস আরাগচি বোঝাতে চাইছেন যে, ইরান একটি সম্মানজনক চুক্তিতে আসতে আগ্রহী, কিন্তু ট্রাম্পের একতরফা চাপ সেই পথকে রুদ্ধ করছে। ইউরোপ যদি এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হয়, তবে ট্রাম্পের ওপর এক ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে যা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।
আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রেও আরাগচি অত্যন্ত কৌশলী। ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো যারা ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে, তাদের মাধ্যমে ইউরোপকে এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে—ইরান তার ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং কৌশলগত পানিপথ নিয়ে আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কতটা বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে তার ওপর।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই ‘ইউরোপীয় কার্ড’ খেলাটি ট্রাম্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি ইউরোপ ইরানের প্রস্তাবে কিছুটা হলেও সায় দেয়, তবে ইরানকে একঘরে করে রাখার মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খাবে। সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদের দ্বিতীয় দফার বৈঠকের আগে তেহরানের এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াই এখন কেবল রণক্ষেত্রে নয়, বরং ইউরোপের ড্রয়িংরুমগুলোতেও সমান্তরালভাবে চলছে।

