মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন কিছুটা শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে আছড়ে পড়ল মার্কিন প্রযুক্তির এক অনন্য বিস্ময়। গত ৯ এপ্রিল পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বিধ্বস্ত হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী নজরদারি ড্রোন ‘এমকিউ-৪সি ট্রাইটন’। যুক্তরাষ্ট্রের নাভাল সেফটি কমান্ডের এক সাম্প্রতিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিধ্বস্ত হওয়া এই ড্রোনটি কেবল কোনো সাধারণ যন্ত্র ছিল না; সামরিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি পরিচিত ‘ডানাযুক্ত উপগ্রহ’ বা ‘স্যাটেলাইট উইথ উইংস’ নামে। নর্থরোপ গ্রুম্যান কোম্পানির তৈরি এই এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোনটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি চালাতে সক্ষম। মার্কিন কোষাগার থেকে এই একটি মাত্র ড্রোন তৈরি ও মোতায়েন করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৮১ লাখ মার্কিন ডলার। আকাশ থেকে সাগরের প্রতিটি ইঞ্চি স্ক্যান করার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ড্রোনটির পতন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাভাল সেফটি কমান্ড এই ঘটনাকে ‘ক্লাস এ মিসহ্যাপ’ বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জানা গেছে, ড্রোনটি মূলত ইতালির সিসিলিতে অবস্থিত সিগোনেল্লা নাভাল এয়ার স্টেশনের সম্পদ ছিল। ৯ এপ্রিল হরমুজ প্রণালিতে একটি রুটিন ৩ ঘণ্টার নজরদারি মিশনে অংশ নিতে এটি আকাশে ওড়ে। কিন্তু মিশন শেষে ফেরার পথেই ঘটে বিপত্তি।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক সাইট ‘দ্য ওয়ার জোন’ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি আকাশে প্রায় ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছিল। হঠাৎ করেই এটি জরুরি বিপদ সংকেত পাঠাতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে উচ্চতা হারিয়ে ১০ হাজার ফুটের নিচে নেমে আসে। এরপরই রাডার থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় কয়েকশ কোটি টাকার এই সমরাস্ত্র। সাগরের বিশাল জলরাশিতে ড্রোনটির সলিল সমাধি ঘটেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই ঘটনার সময়কাল নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাত্র দুই দিন আগেই একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছিল। শান্তির সেই বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই এই দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহের দানা বাঁধছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছক যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো শক্তির হাত?
এখন পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীর বিবৃতিতে কোনো শত্রুপক্ষের হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বরাবরই একটি স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর আগেও ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে ইরানের হাতে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, যা দুই দেশকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। বর্তমান যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে এই ড্রোন বিধ্বস্তের ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা উসকে দেয় কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ায় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
২৪ কোটি ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি খুঁজে বের করতে উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করেছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে এমকিউ-৪সি ট্রাইটনের মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তির ড্রোন যদি প্রতিপক্ষের হাতে পড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল আর্থিক নয়, কৌশলগত বড় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করবে।
আপাতত তদন্তকারীরা ড্রোনটি থেকে পাঠানো শেষ মুহূর্তের ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করছেন। যান্ত্রিক গোলযোগ নাকি সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ড্রোনটির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল—সেই রহস্যের জট খুলতে কাজ করছে পেন্টাগন। এই বিধ্বস্ত ড্রোনটি এখন কেবল সাগরের তলায় পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ নয়, বরং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর কূটনৈতিক সম্পর্কের এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

