মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকটের জেরে ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করল ইতালি। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তার দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করছে না। দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্ব বাতিলের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় ইতালি ও ইসরায়েল একে অপরের সঙ্গে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম, মরণঘাতী অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি গবেষণা আদান-প্রদান করত। মেলোনির এই ঘোষণার ফলে দুই দেশের মধ্যকার কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
ইতালির জাতীয় সংবাদ সংস্থা আনসা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি স্পষ্ট করে বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে আর সমর্থন দিতে পারছে না রোম।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ভয়াবহ গণহত্যা এবং সম্প্রতি ইরানে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে চালানো উসকানিমূলক হামলার কারণেই ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তেল আবিবের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এতদিন পশ্চিমা মিত্র হিসেবে পাশে থাকলেও, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের দায়ে এখন পিছু হটতে শুরু করেছে অনেক দেশ।
ইতালির এই সিদ্ধান্ত আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এর আগে স্পেনও ইসরায়েলে সব ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে ইতালিও একই পথে হাঁটল। এর ফলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাত বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতালির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, যখন একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে আগ্রাসন চালায়, তখন তাকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়া মানে অপরাধে ইন্ধন দেওয়া। মেলোনি সরকার সেই ইন্ধন বন্ধের সাহসী বার্তা দিল।
তবে এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল-ইতালি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতার যে কাঠামো ছিল, তা এই চুক্তির অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও, গাজার রক্তপাত আর ইরানের সাথে যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে ইতালির সাধারণ জনগণের মধ্যে যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা মেলোনি সরকারের ছিল না।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের মাটিতে ইসরায়েল এখন ক্রমেই বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। ইতালির মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তেল আবিবের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আগামীর দিনগুলোতে আরও কোনো ইউরোপীয় দেশ এমন কড়া পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

