মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশে যখন যুদ্ধের ঘনঘটা, তখন দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিল সৌদি আরব। গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সাদ জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তেহরানের যেকোনো ইতিবাচক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে রিয়াদ পূর্ণ সমর্থন দেবে।
আলাপকালে দুই নেতার মধ্যে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির গভীর সংকটগুলো উঠে আসে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাতের পর সৃষ্ট ঝুঁকি এবং ওয়াশিংটনের কথিত ‘উসকানিমূলক’ আচরণের বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন আরাঘচি। গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে রুদ্ধদ্বার শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার ভেতরের খবরও রিয়াদকে জানানো হয়।
ইসলামাবাদ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান অত্যন্ত সদিচ্ছা নিয়ে যুদ্ধবিরতি মেনে আলোচনার টেবিলে বসেছিল। কিন্তু মার্কিন প্রতিনিধিদের ‘অন্যায্য ও মাত্রাতিরিক্ত’ আবদার এবং অনড় অবস্থানের কারণে ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। আরাঘচির দাবি, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্বাসের অভাবই মূলত শান্তি প্রক্রিয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জবাবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলমান কূটনৈতিক জটিলতাগুলো শেষ পর্যন্ত কেটে যাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সৌদি আরব চায় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটুক এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে আসুক। রিয়াদের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, কারণ সুন্নি প্রধান দেশটি এই সংকটে সরাসরি পক্ষ না নিলেও তেহরানের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ সংহতি প্রকাশ করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলার পর শুরু হওয়া এই সংঘাত আজ ৪০ দিনে পদার্পণ করেছে। এই সময়ের মধ্যে ইরান কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকেনি, বরং পাল্টাপাল্টি আক্রমণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তেহরানের সামরিক সক্ষমতা পশ্চিমাদের দ্রুত বিজয়ের পরিকল্পনাকে কার্যত নস্যাৎ করে দিয়েছে।
সংঘাত থামাতে গত ৮ এপ্রিল থেকে যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তারই অংশ ছিল ইসলামাবাদ বৈঠক। সেখানে ইরান সেনা প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ১০ দফা প্রস্তাব দিলেও মার্কিন পক্ষ তা গ্রহণ করেনি। ফলে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে।
বর্তমানে হরমোজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং আলোচনার ব্যর্থতা পুরো অঞ্চলকে আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি-ইরান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই আলাপচারিতা শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে কিছুটা হলেও আশার আলো জাগিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—তারা শান্তি চায়, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কোনো আপস করবে না।
আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরবের এই কূটনৈতিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার গভীর ফাটল মেটাতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে রিয়াদের এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

