বিশ্বরাজনীতির মোড়লিপনায় চীন যে এখন আর কেবল নেপথ্যের খেলোয়াড় নয়, তার প্রমাণ মিলল আবারও। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত নিরসনে চার দফার একটি উচ্চাভিলাষী শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এই বিশেষ প্রস্তাবনার কথা প্রকাশ করেছে।
আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বেইজিংয়ের এই নতুন অবস্থান তুলে ধরেন শি। তার এই প্রস্তাবের মূলে রয়েছে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের শাসন’। শি জিনপিং মনে করেন, কেবল পেশিশক্তি দিয়ে নয়, বরং দেশগুলোর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই পারে এই অঞ্চলের ভাগ্য বদলাতে।
সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির নাক গলানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব পথে চলার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি বলছে, শি জিনপিংয়ের এই চার দফা প্রস্তাব মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যপ্রাচ্য গড়ার নীলনকশা। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের একমাত্র পথ হলো আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং আলোচনার টেবিলে সব পক্ষকে সমান মর্যাদা দেওয়া।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি যুদ্ধ এবং হরমোজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে, তখন বেইজিং নিজেকে একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাহির করতে চাইছে।
শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবে উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে একই সুতায় গাঁথা হয়েছে। তার মতে, কেবল অস্ত্র বিরতি দিয়ে শান্তি আসবে না। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল উগ্রবাদ ও সংঘাতের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব। অর্থাৎ, তিনি ‘উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি’র তত্ত্ব প্রচার করছেন।
বৈঠকে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সকে আশ্বস্ত করে শি বলেন, চীন সবসময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ন্যায্য দাবির পাশে থাকবে। চীনের এই কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত এই অঞ্চলে মার্কিন একাধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা বা ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেইজিং চাইছে আরবের দেশগুলো যেন কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পুতিনের ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের প্রস্তাব আর শি জিনপিংয়ের এই চার দফা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন পশ্চিমা বলয় থেকে ধীরে ধীরে পূর্বাঞ্চলীয় শক্তির দিকে সরছে। চীনের এই প্রস্তাব যদি বিবাদমান পক্ষগুলো গুরুত্বের সাথে নেয়, তবে তা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ের এই ‘শান্তি বার্তা’ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের খেলায় চীন এখন আর নীরব দর্শক নয়, বরং তারা নিজের মতো করে ছক সাজাতে শুরু করেছে। যা বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ করল।

