মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাসে এখন যুদ্ধের দামামা। দীর্ঘদিনের হুমকি-ধামকি পেরিয়ে এবার সরাসরি অ্যাকশনে নেমেছে ওয়াশিংটন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে ইরানের উপসাগরীয় অঞ্চলের সব কটি বন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে অবরুদ্ধ করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) এই পদক্ষেপের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নজিরবিহীন সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজের ক্ষেত্রেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। অর্থাৎ, কোনো জাহাজ যদি ইরানের কোনো বন্দরের দিকে যায় বা সেখান থেকে পণ্য নিয়ে বেরিয়ে আসে, তবে সেটিকে মার্কিন নৌবাহিনীর বাধার মুখে পড়তে হবে। তবে এই কড়াকড়ি কেবল ইরানের বন্দরের জন্য প্রযোজ্য; উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের বন্দরে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো বিধি-নিষেধ থাকছে না।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বিবৃতির মাধ্যমে তাদের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছে। তারা জানিয়েছে, ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর পূর্বে আরব সাগরে অবস্থানরত সকল বাণিজ্যিক ও কার্গো জাহাজের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া এই ‘অবরুদ্ধ’ এলাকায় কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে সেটিকে আটক করা, মাঝপথে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা কিংবা সরাসরি জব্দ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর পদক্ষেপের পর তেহরানের পক্ষ থেকেও এসেছে পাল্টা চরম হুঁশিয়ারি। ইরানের শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) এক মুখপাত্র এই অবরোধকে ‘অবৈধ’ এবং ‘সামুদ্রিক দস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা যদি ইরানের জন্য নিশ্চিত না থাকে, তবে এই অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের বন্দরও নিরাপদ থাকবে না।
ইরানি কর্মকর্তাদের এই প্রচ্ছন্ন হুমকি মূলত পুরো অঞ্চলের তেল বাণিজ্যের জন্য এক অশনি সংকেত। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে শত্রুভাবাপন্ন দেশের জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বন্দরগুলোকেই অচল করে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করায় সংঘাতের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা। বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো দেশগুলো তাদের উৎপাদিত তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য মূলত এই রুটের ওপরই নির্ভরশীল। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই মুখোমুখি অবস্থান বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ মূলত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি চূড়ান্ত চেষ্টা। বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করার অর্থ হলো ইরানের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পুরোপুরি থমকে যাওয়া। এর ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যেমন প্রভাব পড়বে, তেমনি সরকারের সামরিক সক্ষমতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে ইরান যেভাবে পাল্টা হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
লন্ডনভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর বড় একটি বহর ইতিমধ্যে ওমান উপসাগরে টহল দিচ্ছে। আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। কোনো জাহাজ যদি চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে ইরানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন সেনারা সেটি জব্দ করতে দ্বিধা করবে না। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরের উপকূলজুড়ে ইরানও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুতগামী নৌযান মোতায়েন করে রেখেছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলেও। অনেক দেশই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, সামুদ্রিক বাণিজ্যের এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মন্দা ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা এখন বিকল্প পথের সন্ধানে অস্থির।
সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ধরনের অবরোধ আইনিভাবে বেশ বিতর্কিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র একে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদ দমনে’র অংশ হিসেবে দাবি করছে। অন্যদিকে, তেহরান একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই নতুন মেরুকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। যদি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, তবে এই ‘সমুদ্র যুদ্ধ’ হয়তো স্থলভাগেও ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেবে না।

