দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুই পক্ষ ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ)’ স্বাক্ষর করার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন প্রতিনিধিদের অনড় অবস্থান এবং নতুন শর্তারোপের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়।
রোববার (১২ এপ্রিল ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং যুদ্ধের বিভীষিকা বন্ধের সদিচ্ছা নিয়েই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সংলাপে যোগ দিয়েছিল। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে এমন নিবিড় ও সরাসরি সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো, যা বিশ্বজুড়ে আশার আলো জাগিয়েছিল।
চুক্তি কেন ভেস্তে গেল? ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, আলোচনার টেবিল যখন চূড়ান্ত সমঝোতার খুব কাছাকাছি, ঠিক তখনই মার্কিন প্রতিনিধিরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। আরাগচি অভিযোগ করেন, শেষ মুহূর্তে আলোচনার মূল ইস্যুগুলো বদলে ফেলা এবং নতুন করে অবরোধের হুমকি দেওয়ার ফলে সংলাপ অচলাবস্থার দিকে মোড় নেয়।
এক্সে তিনি লিখেছেন, “আমরা যখন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে ছিলাম, তখনই আমাদের চরমপন্থী অবস্থান ও লক্ষ্য পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হয়। সদিচ্ছা থেকেই সদিচ্ছার জন্ম হয়, কিন্তু শত্রুতা কেবল শত্রুতাকেই ডেকে আনে।” আরাগচি এই ব্যর্থতাকে বড় ধরনের কূটনৈতিক ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করে আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, দীর্ঘ আলোচনার পর তাদের প্রাপ্তি শেষ পর্যন্ত ‘শূন্য’।
রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পটভূমি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতের শিকড় দীর্ঘদিনের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে হলেও, চলতি বছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গত ৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন আলোচনার পরও কোনো ফল না আসায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত এই হামলায় যোগ দেয় ইসরায়েলও, যাদের অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’।
এই যুদ্ধের শুরুতেই ইরান এক ভয়াবহ ধাক্কার সম্মুখীন হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় দেশটির দীর্ঘ ৩৭ বছরের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় তার স্ত্রী, কন্যা এবং নাতিসহ পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারান। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।
শান্তির চেষ্টা ও ইসলামাবাদের ব্যর্থতা
টানা দেড় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্বনেতাদের চাপে গত ৭ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে উভয় পক্ষ। লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক টেবিলে বসে স্থায়ী সমাধান খোঁজা। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বসেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকে শান্তির একটি খসড়া তৈরি করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট এতটাই গভীর যে সামান্য মতপার্থক্যও বড় ধরনের ফাটল তৈরি করছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিনিময়ে ইরানের প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা নিয়ে দুই পক্ষ একমত হতে পারছে না।
ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে আটকে যাওয়ায় এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও বৈশ্বিক অর্থনীতি আবারো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে।

