রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত সেন্টার ফর কিডনি ডিসিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে আলোচিত চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মঈন উদ্দিন মঈনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) সকালে নড়াইলের কালিয়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঈন স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
র্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখা থেকে পাঠানো এক খুদে বার্তায় এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অভিযানে মঈন ছাড়াও তার আরও ছয় সহযোগীকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারকৃত অন্য ছয়জনের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করেনি সংস্থাটি।
তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া র্যাব-৬ এর একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নড়াইলে অভিযান চালিয়ে মামলার এক নম্বর আসামি মঈনকে কব্জায় নেয়। এর আগে গত কয়েক দিনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মঈনের চার ঘনিষ্ঠ সহযোগী—মো. ফালান মিয়া (৪২), মো. রুবেল (৪২), মো. সুমন (৩৬) ও মো. লিটন মিয়াকে (৩৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট সাতজনকে আইনের আওতায় আনা হলো।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডা. কামরুল ইসলামের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসকের হাসপাতালে ঢুকে প্রকাশ্যে হুমকি ও চাঁদা দাবির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে।
মূল ঘটনা ও জনরোষ
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১১ এপ্রিল। রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় কম খরচে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য সুপরিচিত সিকেডি হাসপাতালে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তারা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত সার্জন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে এবং হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। ফুটেজে দেখা যায়, অভিযুক্ত মঈন ও তার অনুসারীরা হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকে ঢুকে কর্মীদের হেনস্তা করছে। ডা. কামরুলের মতো একজন মানবহিতৈষী চিকিৎসকের সঙ্গে এমন আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম গত ১৮ বছর ধরে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রায় ২ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেশে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তার ওপর এমন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজির চেষ্টা সাধারণ নাগরিক ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি পদক্ষেপ
অভিযুক্ত মঈন উদ্দিন নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিলেও বিএনপি বা যুবদলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে এর দায় অস্বীকার করা হয়েছে। যুবদলের শীর্ষ নেতারা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে তার দায় দল নেবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ইনচার্জ আবু হানিফ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় এই চাঁদাবাজি ও হুমকির মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মামলায় মঈনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা হাসপাতালে প্রবেশ করে প্রশাসনিক কাজে বাধা দেয় এবং মোটা অংকের টাকা না দিলে হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মঈন চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন কি না, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্রিফিং করা হয়নি। তবে র্যাব জানিয়েছে, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী এবং বিশেষ করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পেশাজীবীদের উদ্বেগ
ডা. কামরুলের হাসপাতালে এই হামলার পর রাজধানীর চিকিৎসকদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) এবং বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। তারা বলছেন, সেবা প্রতিষ্ঠানে যদি রাজনৈতিক পরিচয়ে এমন তাণ্ডব চালানো হয়, তবে চিকিৎসকরা প্রাণ খুলে সেবা দিতে পারবেন না।
বর্তমানে ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালটিতে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ রোগীরা যারা দূর-দূরান্ত থেকে উন্নত কিডনি চিকিৎসার আশায় এখানে আসেন, তারাও এমন ঘটনায় উদ্বিগ্ন।
র্যাব জানিয়েছে, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মঈনকে ঢাকায় এনে আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি চলছে।

