ইসলামাবাদের ম্যারাথন বৈঠক কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এখন সবার নজর হোয়াইট হাউসের দিকে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের প্রতিনিধিরা যখন রিক্ত হাতে টেবিল ছাড়লেন, তখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তূণে আর কী অস্ত্র বাকি আছে? ২১ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়া দুই সপ্তাহের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর বিশ্ব কি আবার বড় কোনো সংঘাতের সাক্ষী হতে যাচ্ছে, নাকি পর্দার আড়ালে চলবে নতুন কোনো চাল?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হাতে এখন প্রধান হাতিয়ার হলো পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান বা ‘ফুল স্কেল অ্যাটাক’-এর হুমকি দেওয়া। কিন্তু এই হুমকির কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনের অন্দরেই সংশয় রয়েছে। কারণ, যুদ্ধের দামামা বাজানো যতটা সহজ, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তা বজায় রাখা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। আর তেহরান এই দুর্বলতাটুকু বেশ ভালোভাবেই জানে।
তেলের রাজনীতি ও হরমুজ প্রণালির ফাঁস
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের এই প্রধান ধমনীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই গত সপ্তাহে তিনি তড়িঘড়ি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। এই সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সার থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির অপরিহার্য উপাদান হিলিয়ামের সরবরাহে।
আমেরিকান ভোটারদের কাছে মুদ্রাস্ফীতি সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। যদি যুদ্ধ আবার শুরু হয়, তবে শেয়ার বাজারে ধস নামবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। ফলে সামরিক অভিযানের হুমকি দিলেও বাস্তবে ট্রাম্পকে পা ফেলতে হচ্ছে অত্যন্ত মেপে।
ইরানের দাবি ও দরকষাকষির নতুন অস্ত্র
ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরান একটি দীর্ঘ তালিকা পেশ করেছে, যেখানে হরমুজ প্রণালিকে তারা সবচেয়ে শক্তিশালী ‘ইকোনমিক ওয়েপন’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এক সময় যে জলপথ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না, সেটিই এখন তেহরানের প্রধান হাতিয়ার। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট—পরমাণু ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি তাদের ওপর চালানো বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
ওয়াশিংটন ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিলেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন শর্ত ছিল— ইরানকে আগে চুক্তির শর্ত পালন শুরু করতে হবে। ‘আগে আপনি, না আগে আমি’— এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে আটকে গেছে পুরো প্রক্রিয়া। তেহরান এখন টিকে থাকাকেই তাদের বিজয় হিসেবে দেখছে, আর ওয়াশিংটন মনে করছে তাদের বোমাবর্ষণ ইরানকে কোণঠাসা করতে পেরেছে।
অহমিকার লড়াইয়ে পিষ্ট কূটনীতি
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, দুই পক্ষই এখন নিজেদের প্রথম দফার ‘বিজেতা’ মনে করছে। এই ধরনের মানসিকতা সাধারণত আপসের পথকে আরও কঠিন করে তোলে। ট্রাম্পের সামনে এখন বিকল্প খুব সীমিত। তিনি যদি আবার যুদ্ধ শুরু করেন, তবে মার্কিন অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। আবার যদি ইরানের সব শর্ত মেনে নেন, তবে তার ‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২১ এপ্রিলের ডেডলাইন যত ঘনিয়ে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ততই ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ট্রাম্পের সামনে এখন সম্ভবত একমাত্র পথ হলো অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির মাধ্যমে তেহরানকে টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে তার আগে ওয়াশিংটনকে হয়তো স্বীকার করে নিতে হবে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমানোর দিন ফুরিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউস কি তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা বেছে নেবে, নাকি আত্মসম্মানের লড়াইয়ে বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।

