ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক থেকে কোনো বড় ধরনের সাফল্য না আসলেও, একে পুরোপুরি ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখতে নারাজ ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা গভীর সংকট মাত্র একটি বৈঠকেই মিটে যাবে—এমন আশা করা ছিল অবাস্তব।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল ‘আইআরআইবি’-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বাকাই বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই শুরু থেকে একটি বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। শুধু আমরাই নই, বাস্তববাদী কোনো পক্ষই এমনটা আশা করেনি।” তার এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আলোচনার টেবিলে বরফ গলতে আরও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।
কূটনীতির দীর্ঘ পথ ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের যে বৈঠক হয়েছে, তাকে একটি প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে দেখছে তেহরান। বাকাই স্পষ্ট করেছেন যে, চুক্তি না হলেও সংলাপের পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, পাকিস্তান এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনই আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠতে চাইছে না। কারণ গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এত দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি কথা বলেছেন। যদিও পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই মেরুর অবস্থান এখনো অনড়, তবুও আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধের ক্ষত ও খামেনি পরিবারের ট্র্যাজেডি
এই আলোচনার নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়াবহ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরায়েলি অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ ইরানের রাজনৈতিক মানচিত্রকে ওলটপালট করে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই প্রাণ হারান ইরানের দীর্ঘ ৩৭ বছরের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এই হামলায় কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, খামেনি পরিবারের ওপরও বড় আঘাত আসে। খামেনির স্ত্রী, কন্যা ও নাতি নিহত হওয়ার পাশাপাশি তার ছেলে মোজতবা খামেনির স্ত্রীও প্রাণ হারান। মোজতবা নিজে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এমন এক ব্যক্তিগত ও জাতীয় শোকের আবহে ইরানের প্রতিনিধিরা আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন, যা তাদের অবস্থানের কঠোরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শান্তির খোঁজে ৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি
টানা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গত ৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। সেই যুদ্ধবিরতির পরিবেশেই গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি সংলাপে বসেন প্রতিনিধিরা। ২১ ঘণ্টার সেই রুদ্ধশ্বাস আলোচনায় মূলত একে অপরের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম’ প্রস্তাব দেওয়ার কথা বলা হলেও ইরান বিষয়টিকে দেখছে ভিন্নভাবে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনকে তাদের একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। তবে ইসমাইল বাকাইয়ের আজকের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয় সুর পাওয়া গেছে, যা অন্তত এই বার্তাই দেয় যে ইরান এখনই সব কূটনৈতিক দরজা বন্ধ করে দিতে চায় না।
সামনের দিনগুলো যেদিকে যাচ্ছে
আপাতত ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন প্রতিনিধি দল বিদায় নিলেও আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে আলোচনার গুঞ্জন থামেনি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং অন্যান্য আরব দেশগুলোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইসমাইল বাকাইয়ের কথায়, “এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।”
এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে তেহরানের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার দিকে। খামেনি পরবর্তী নতুন ইরানের নেতৃত্ব এই ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ নিয়ে কীভাবে দর কষাকষি করে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা থামবে নাকি আবার নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু হবে। তবে এক বৈঠকেই সব সমাধান হবে—এমন আকাশকুসুম কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী কূটনীতির দিকেই হাঁটার ইঙ্গিত দিল ইরান।

