দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস আলোচনা, কূটনৈতিক টানাপড়েন আর বিশ্ববাসীর রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা—সবই যেন আপাতত নিস্ফল হলো। ইসলামাবাদের বসন্তের সকালে যখন নতুন কোনো আশার আলো দেখার কথা ছিল, তখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ঘোষণা করলেন এক অমীমাংসিত সমাপ্তির। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি দর কষাকষি করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ওয়াশিংটন।
রোববার সকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আলোচনার টেবিল থেকে তারা এখন বিদায় নিচ্ছেন। তবে যাওয়ার আগে তেহরানের জন্য রেখে যাচ্ছেন একটি ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম’ প্রস্তাব। এখন বল সম্পূর্ণভাবে ইরানের কোর্টে। তারা এই প্রস্তাব মেনে নেবে নাকি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ আরও চড়বে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর কূটনৈতিক রাত
ইসলামাবাদের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কূটনৈতিক জোনে গত দুই দিন ধরে যা চলেছে, তাকে আধুনিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসেছিলেন। লক্ষ্য ছিল—অচলাবস্থা নিরসন। ভ্যান্সের কন্ঠে ছিল দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ, তবে শব্দে ছিল পেশাদারিত্বের দৃঢ়তা।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা টানা ২১ ঘণ্টা ধরে টেবিলে ছিলাম। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, আমরা কোনো চুক্তিতে সই করতে পারিনি।” তার এই বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের ভূমিকা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
এই আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে পাকিস্তান এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শাল মুনিরের ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রশংসা করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভ্যান্স অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, আলোচনার এই ব্যর্থতার জন্য আয়োজক দেশ হিসেবে পাকিস্তান কোনোভাবেই দায়ী নয়।
“পাকিস্তানিরা আমাদের আতিথেয়তা এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে অসাধারণ কাজ করেছে। এখানে যদি কোনো ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তার দায় আমাদের বা ইরানিদের, পাকিস্তানিদের নয়,” যোগ করেন ভ্যান্স। ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকারী ইমেজ ভবিষ্যতে দেশটিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সুবিধা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘সৎ উদ্দেশ্য’ বনাম ‘অমীমাংসিত বাস্তবতা’
যুক্তরাষ্ট্র কেন এই আলোচনায় সফল হতে পারল না, তার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়ার চেষ্টা করেছেন জে ডি ভ্যান্স। তার দাবি, ওয়াশিংটন এবার অত্যন্ত নমনীয় মনোভাব এবং ‘সৎ উদ্দেশ্য’ নিয়েই আলোচনার টেবিলে বসেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তারা যতটা সম্ভব মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছিলেন।
ভ্যান্সের ভাষায়, “আমরা আমাদের অবস্থান থেকে নমনীয় ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম একটি সমাধান হোক। কিন্তু অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও দুই পক্ষের চাওয়া এক বিন্দুতে মেলে না।” তবে ইরানের পক্ষ থেকে ঠিক কোন পয়েন্টে আপত্তি জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
ট্রাম্পের ছায়া ও হোয়াইট হাউসের তৎপড়তা
পুরো আলোচনা চলাকালীন ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো থেকে টেলিফোনে সবকিছুর তদারকি করছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভ্যান্স জানান, এই ২১ ঘণ্টায় তিনি অন্তত ছয় থেকে বারোবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতি মুহূর্তে ট্রাম্পকে আলোচনার আপডেট দেওয়া হয়েছে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্সের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ট্রাম্পের পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য কুশনারের এই আলোচনায় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই চুক্তিটি হোয়াইট হাউসের জন্য কতটা ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছিল।
চূড়ান্ত প্রস্তাব: তেহরানের জন্য আল্টিমেটাম?
যুক্তরাষ্ট্র এখন পাকিস্তান ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে খালি হাতে নয়, তারা একটি ‘টেক ইট অর লিভ ইট’ (গ্রহণ করো অথবা ছাড়ো) ঘরানার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। ভ্যান্স একে অভিহিত করেছেন ‘চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম’ (Final and Best Offer) হিসেবে। তিনি বলেন, “আমরা একটি অত্যন্ত সহজ এবং পরিষ্কার প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি। এটিই আমাদের শেষ কথা। দেখা যাক ইরানিরা এখন কী করে।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ আসলে ইরানের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। যদি ইরান এই প্রস্তাবে রাজি না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে ওয়াশিংটন আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক পদক্ষেপের পথে হাঁটতে পারে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝেই এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। পুরো মধ্যপ্রাচ্য যখন যুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়ে, তখন এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ইসলামাবাদের এই আলোচনার ফলাফল শূন্য হওয়ায় এখন সবার নজর তেহরানের দিকে। সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের বিশ্ব রাজনীতি।
সাংবাদিকের ডায়েরি থেকে: এক বিফল কূটনৈতিক মিশন
সংবাদ সম্মেলন শেষে যখন ভ্যান্স এবং তার দল সভাকক্ষ ত্যাগ করছিলেন, তখন তাদের চেহারায় ছিল এক ধরনের গাম্ভীর্য। পেশাদারিত্বের আবরণে ঢাকা থাকলেও এটা স্পষ্ট ছিল যে, তারা যে লক্ষ্য নিয়ে পাকিস্তানে এসেছিলেন, তা অর্জিত হয়নি। একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ হয়তো তাদের মনে কাজ করছে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান, তখন পেছনের শূন্যতাটুকু বড় হয়ে দেখা দেয়। পাকিস্তান থেকে মার্কিন বিমানটি উড্ডয়ন করার সাথে সাথেই হয়তো শুরু হবে নতুন কোনো কূটনৈতিক লড়াই অথবা যুদ্ধের দামামা। আপাতত আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে বিশ্ব নেতাদের।
সংবাদ সম্মেলন শেষে ইসলামাবাদের রাজপথেও যেন এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। ২১ ঘণ্টার ক্লান্তি শেষে কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বিশ্রামে গেলেও, বিশ্ব রাজনীতি আজ থেকে এক নতুন অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াল। ভ্যান্সের রেখে যাওয়া ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ কি শান্তির বার্তা আনবে, নাকি এটিই হবে বড় কোনো সংঘাতের ভূমিকা—সময়ই তার উত্তর দেবে।

