পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে, তখন ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে বসে এক চপল কিন্তু অর্থবহ মন্তব্য করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাঁধে এই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কঠিন কূটনৈতিক মিশনের ভার। আর সেই মিশন নিয়েই ট্রাম্পের মন্তব্য—সফল হলে কৃতিত্ব তার নিজের, আর ব্যর্থ হলে সব দায় ভ্যান্সের।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ইস্টার লাঞ্চ চলাকালীন এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প রসিকতার সুরে বলেন, “যদি এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে আমি জেডি ভ্যান্সকে দায়ী করব। আর যদি এটি সফল হয়, তবে এর পুরো কৃতিত্ব আমি নিজে নেব।” উপস্থিত কর্মকর্তারা এই কথায় হাসিতে ফেটে পড়লেও, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে ভিন্ন সমীকরণ দেখছেন। তারা মনে করছেন, এই একটি বাক্যের মাধ্যমে ট্রাম্প তার ডেপুটির ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্সের জন্য এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট। ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হওয়াকে বিশেষজ্ঞরা ‘পলিটিক্যাল মাইনফিল্ড’ বা রাজনৈতিক মাইনক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে গত ছয় সপ্তাহের প্রলয়ঙ্করী সামরিক সংঘাতের পর বিশ্ব অর্থনীতি যখন খাদের কিনারে, তখন এই শান্তি আলোচনার সফলতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
ভ্যান্সের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো পাহাড়সম। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পরিবর্তন করেন—কখনো শান্তির পায়রা ওড়ান, আবার কখনো ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার হুমকি দেন। অন্যদিকে তেহরান সরকার, যারা বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শক্ত হাতে ধরে রেখেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান; তেল আবিব কোনোভাবেই অসম্পূর্ণ বা দুর্বল কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে নারাজ।
২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেডি ভ্যান্সকে একজন শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক বা ‘মাগা’ (MAGA) গোষ্ঠী এই সফরের প্রতিটি মুহূর্ত খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। ব্যক্তিগতভাবে ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক এই মেরিন সেনা বিদেশি যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। এমনকি ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার আগেও তিনি ট্রাম্পের কাছে নিজের সংশয় প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভ্যান্সকে এই বৈঠক থেকে শূন্য হাতে ফিরলে চলবে না। বড় কিছু অর্জন করতে না পারলে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও গুরুত্ব—উভয়ই ধূলিসাৎ হতে পারে।” ট্রাম্পের ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার এই ভঙ্গি আসলে ভ্যান্সকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই খেলায় হারলে তার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে।
ইসলামাবাদের এই আলোচনা কেবল একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি নয়, বরং এটি জেডি ভ্যান্সের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লিটমাস টেস্ট। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আটকে রাখা—এই দ্বিমুখী লক্ষ্য অর্জনে ভ্যান্স কতটা সফল হন, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৮ সালের হোয়াইট হাউসের চাবিকাঠি। ট্রাম্পের মজার ছলে দেওয়া সেই ‘হুমকি’ এখন ইসলামাবাদের আলোচনার টেবিলে ভ্যান্সের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী।

