যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পারস্য উপসাগরে নতুন করে উত্তজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তেহরানের পূর্ব অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা সরাসরি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ে ইরানের এমন কঠোর অবস্থান যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার রাতে ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে অবস্থানরত সব বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়নি। যদি কোনো জাহাজ ইরানের সার্বভৌমত্ব ও জলসীমার নিয়ম অমান্য করে এই রুট ব্যবহারের চেষ্টা করে, তবে তাকে সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হবে।
অথচ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেটে হেগসেথ এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে, সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই দুটি জাহাজ এই পথ দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করলে ইরানি নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এই চরম সতর্কতা আসে। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রণালীটি আগামী শুক্রবার থেকে অত্যন্ত সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত আকারে খোলা হতে পারে।
মূলত আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তেহরান সম্ভবত সেই বৈঠককে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে। অর্থাৎ, কূটনৈতিক টেবিলে অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথটি কতটুকু উন্মুক্ত হবে।
তবে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কেবল হরমুজ সংকটে নয়, বরং ইসরায়েলের আগ্রাসনেও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যা সরাসরি যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই আকস্মিক হামলায় কয়েকশ মানুষ হতাহত হয়েছেন। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি আর অন্যদিকে লেবাননে ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দিনের শান্তি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যদি ইসরায়েলের এই হামলা অব্যাহত থাকে, তবে তেহরান হয়তো তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে পুনরায় পাল্টাহামলার পথ বেছে নিতে পারে।
আপাতত হরমুজ প্রণালীতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় গভীর উদ্বেগে রয়েছে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো। ইরানের নৌবাহিনীর এই ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি কেবল মৌখিক হুঁশিয়ারি নাকি নতুন কোনো বড় যুদ্ধের পূর্বাভাস, তা নির্ভর করছে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া আগামী শুক্রবারের বৈঠকের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি করা ‘স্বর্ণযুগ’ কতটুকু সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। শান্তির বার্তা নিয়ে শুরু হওয়া বুধবারটি শেষ পর্যন্ত রক্তের দাগ আর ধ্বংসের হুমকিতে শেষ হলো। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বশক্তিগুলো এই উত্তেজনা প্রশমনে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

