ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এবার তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ নিয়ে মুখ খুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই সমঝোতার আওতায় ইরানের হাতে থাকা ইউরেনিয়ামের বিষয়ে এমন এক ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাকে তিনি ‘নিখুঁত যত্ন’ বলে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ নিরসনে এটিই ছিল এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত।
বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইরানের মজুতকৃত ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী? অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট উত্তর দেন, “সেটির নিখুঁতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একদম যথাযথভাবে। যদি আমি নিশ্চিত না হতাম যে এর একটি চূড়ান্ত ফয়সালা হবে, তবে আমি কখনোই এই মীমাংসায় আসতাম না।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো কঠোর বা সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পেয়েছে।
ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতিকে কেবল একটি সামরিক বিরতি হিসেবে দেখছেন না, বরং একে তিনি অভিহিত করেছেন ‘বিশ্ব শান্তির জন্য একটি বড় দিন’ হিসেবে। তার মতে, দীর্ঘ সংঘাতের পর ইরান এখন তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। দুই সপ্তাহের এই সময়সীমা যদি সফলভাবে অতিবাহিত হয়, তবে ইরানের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নতুন পথ উন্মোচন হতে পারে বলে মনে করছে হোয়াইট হাউজ।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি লিখেছেন, “বিশ্ব শান্তির জন্য আজ একটি মহান দিন! ইরান এটিই চেয়েছিল, তারা অনেক সহ্য করেছে। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশও শান্তি চায়।” ট্রাম্পের এই বার্তার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, তিনি এই সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাপ্তি ঘটিয়ে একে নিজের কূটনৈতিক জয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।
প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল যুদ্ধবিরতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নৌ-বাণিজ্য সচল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের যে জট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ওয়াশিংটন সরাসরি সহায়তা করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “সেখানে প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ইরান তাদের দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারবে।”
মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে প্রয়োজনীয় রসদপত্র সরবরাহ করবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যাতে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়, তা তদারকি করবে। ট্রাম্পের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে বলেন, “আমরা যেমনটা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে দেখছি, ঠিক তেমনি এটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন স্বর্ণযুগ।”
তবে ট্রাম্পের এই ‘স্বর্ণযুগের’ স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে। ইউরেনিয়ামের ‘নিখুঁত যত্ন’ বলতে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন—তা কি ইরান থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, নাকি কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ—সেটি এখনো ধোঁয়াশা। তাসত্ত্বেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ইতিবাচক সুর অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য হলেও বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ও বৈশ্বিক উদ্বেগকে কিছুটা স্তিমিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এখন সবার চোখ তেহরানের দিকে। ট্রাম্পের এই ‘সুপারভাইজড’ পুনর্গঠন এবং পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ ইরান কতটা মেনে নেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর স্থিতিশীলতা। যদি ট্রাম্পের পরিকল্পনা সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এটি হবে এক আমূল পরিবর্তন। আর যদি তা ব্যর্থ হয়, তবে ‘স্বর্ণযুগের’ বদলে এই অঞ্চলটি আরও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে পারে।

