মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা আরও ঘনীভূত করে তুলল ইরানের সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক এক কড়া বার্তা। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিপক্ষ দেশগুলো চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তাদের সামরিক অভিযান স্তিমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ইরানের সেনাবাহিনীর শক্তিশালী শাখা ‘খতম আল-আনবিয়া’ সেন্ট্রাল কমান্ড সদরদপ্তর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে এই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক চরম হুঁশিয়ারির পর। আজ সকালেই হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় মন্তব্য করেন। তিনি হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, ইরানকে একবিংশ শতাব্দী থেকে হটিয়ে দিয়ে পুনরায় ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের এই উস্কানিমূলক বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দিল তেহরান।
খতম আল-আনবিয়া কমান্ডের বিবৃতিতে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক শক্তির প্রকৃত গভীরতা সম্পর্কে পেন্টাগন বা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো সঠিক ধারণাই নেই। বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, বাইরের শত্রু ইরানকে যতটা দুর্বল ভাবছে, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং ধ্বংসাত্মক। পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের রণকৌশল বুঝতে মারাত্মক ভুল করছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
ইরানি কমান্ডাররা আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, তাদের বিশাল এবং সুসংহত কৌশলগত সক্ষমতা সম্পর্কে গোয়েন্দা উপাত্তগুলো অপূর্ণাঙ্গ। মূলত মার্কিন স্যাটেলাইট বা গোয়েন্দা নজরদারির আড়ালে ইরান যে এক বিশাল সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তা এই বার্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তেহরানের দাবি, তাদের তূণে এমন সব অস্ত্র রয়েছে যার সম্পর্কে শত্রুরা এখনো অন্ধকারে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “আপনারা যদি ভেবে থাকেন যে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র বা আধুনিক ড্রোন ইউনিটগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, তবে তা হবে আপনাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।” ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, তাদের দূরপাল্লার নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ড্রোন এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমের মাধ্যমে তারা যেকোনো সময় শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরান তাদের কৌশলগত সামরিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর অবস্থান নিয়ে এক রহস্যময় মন্তব্য করেছে। সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, তাদের প্রধান অস্ত্র কারখানাগুলো এমন সব গোপন ও দুর্গম স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে পৌঁছানো বা যা শনাক্ত করা আধুনিক প্রযুক্তির পক্ষেও অসম্ভব। এই ভূগর্ভস্থ বা পাহাড়ি স্থাপনাগুলো থেকে যুদ্ধের রসদ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে বলে তারা ইঙ্গিত দেয়।
বিবৃতির ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং আপোষহীন। সেখানে বলা হয়েছে, “আমাদের হামলা কেবল শুরু হয়েছে। পরবর্তী আঘাতগুলো হবে আরও বেশি সুনির্দিষ্ট, বিস্তৃত এবং বিধ্বংসী।” ইরান পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে দাঁড়িয়ে আত্মসমর্পণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের এই সামরিক তৎপরতা থামবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই বসন্তে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যে মোড় নিচ্ছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর ইরানের এই পাল্টা অবস্থান তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোও ট্রাম্পের কিছু মন্তব্যে নাখোশ থাকায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে।
ইরানের সামরিক কমান্ডের এই অবস্থানের পর এখন দেখার বিষয় আন্তর্জাতিক কূটনীতি এই সংঘাত থামাতে কতটা সক্ষম হয়। একদিকে ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর হুমকি, অন্যদিকে ইরানের ‘আত্মসমর্পণ পর্যন্ত যুদ্ধ’—এই দুই অনড় অবস্থানের মাঝে সাধারণ মানুষের জীবন এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তেহরানের রাজপথে আজ সেনাবহরের বাড়তি সতর্ক অবস্থানও লক্ষ্য করা গেছে, যা বড় কোনো সংঘাতের আশঙ্কাই বাড়িয়ে তুলছে।

