জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের অমীমাংসিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা এবার রাজপথে গড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যায় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন যে, জনগণের রায় বাস্তবায়নে তারা অচিরেই রাজপথে নামবেন। সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করার পরপরই তিনি এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা রাখা হয়নি। আমরা জনগণকে সাথে নিয়েই রাজপথে নামব। তবে এককভাবে নয়, আমাদের জোটভুক্ত ১১টি দল একত্রে বসে দ্রুতই পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করবে।” তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সংসদীয় বিতর্কে সরকার পক্ষ তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা বিগত কয়েক দিনের সংসদীয় বিতর্কের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, জনগণ কেবল ‘সংবিধান সংশোধনের’ জন্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ‘সংবিধান সংস্কারের’ পক্ষে রায় দিয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, আমরা তার পক্ষেই দাঁড়িয়েছি। সংস্কারের সদিচ্ছা থাকলে কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমরা, কিন্তু সরকার তাতে রাজি হয়নি।”
সরকারের বিরুদ্ধে ‘শব্দ নিয়ে চাতুরীর’ অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, “আইনমন্ত্রী সংসদে দাবি করেছেন যে তিনি আমার প্রস্তাবে আংশিক রাজি হয়েছেন। কিন্তু তিনি ‘সংস্কার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সংশোধন’ ব্যবহার করে আমাকে মিসকোট করেছেন। আমি বারবার বলেছি, এটি হতে হবে সংবিধান সংস্কার, সংশোধন নয়।” তিনি দাবি করেন, স্পিকারের কাছে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
মুলতবি প্রস্তাবের পরিণতি নিয়ে স্পিকারের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা সংসদে এসেছিলাম বিদ্যমান সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে, নতুন কোনো সংকট তৈরি করতে নয়। কিন্তু জাতির দেওয়া ম্যান্ডেটকে যেভাবে অগ্রাহ্য ও অপমান করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রতিবাদেই আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, মূল ইস্যুটিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে নতুন একটি নোটিশ সামনে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগের তিনটি গণভোটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অতীতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের রায় অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবারই প্রথম সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ একমত হয়ে ভোট চাইলেও পরে এসে তা কার্যকর করতে গড়িমসি করা হচ্ছে। তার মতে, এটি সংবিধানের চূড়ান্ত ভিত্তি—জনগণের সার্বভৌমত্বকেই লঙ্ঘন করার শামিল।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সংসদ থেকে সাময়িক ওয়াকআউট করেছি, সংসদ ত্যাগ করিনি। আমরা এখনো সংসদেরই অংশ। কিন্তু যখন ভেতরে কথা বলার বা প্রতিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন আমাদের জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হয়। আমরা জনগণের কাছেই যাব এবং তাদের সাথে নিয়ে গণভোটের দাবি বাস্তবায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করব।”
বিরোধীদলীয় নেতার এই ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ১১ দলীয় জোটের এই সম্ভাব্য আন্দোলন সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, সংবিধান সংস্কারের এই বিতর্ক কেবল সংসদ ভবনের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি এখন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক লড়াইয়ের দিকে মোড় নিচ্ছে।

