পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন বারুদের গন্ধে ভারী। সোমবার গভীর রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বন্দরের নোঙর এলাকায় অবস্থানরত একটি বিশালাকার কুয়েতি তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইরান। এই আকস্মিক আঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় নিরাপত্তা ঝুঁকি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মঙ্গলবার সকালে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই হামলার খবর নিশ্চিত করার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত মাসে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই তেহরান এই পাল্টা আঘাত হেনেছে। পারস্য উপসাগরে নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে ইরান যে কোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত, এই হামলা তারই একটি স্পষ্ট সংকেত। হামলার পরপরই ট্যাংকারটিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, যা দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন বন্দর সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা ‘কুনা’ জানিয়েছে, হামলাটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং সরাসরি। আক্রান্ত ট্যাংকারটি তখন ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে নোঙর করা ছিল। বর্তমান বিশ্ববাজারে যার মূল্য ২০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। কুয়েত এই ঘটনাকে তাদের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছে।
দুবাই বন্দর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দমকল কর্মীরা জাহাজের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে জাহাজের খোলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা পরিবেশবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্যাংকারটি থেকে সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার (Oil Spill) প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদি বিশাল পরিমাণ এই অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তবে পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। দুবাইয়ের উপকূলীয় এলাকায় জরুরি পরিবেশগত সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং তেল নিঃসরণ রোধে বিশেষ দল কাজ শুরু করেছে।
এদিকে, এই হামলার রেশ কেবল সমুদ্রসীমাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কুয়েতের সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। মঙ্গলবার সকালেও তারা বেশ কিছু ‘শত্রুপক্ষীয়’ ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান কেবল জাহাজ নয়, বরং কুয়েতের স্থলভাগকেও লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছে।
এই হামলার সময়কাল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইস্ফাহানে ইরানি স্থাপনায় হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এই পাল্টা আক্রমণ সরাসরি সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থানের জবাবে ইরান তাদের ‘প্রক্সি’ শক্তির বদলে সরাসরি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। এটি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পারস্য উপসাগর দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ খনিজ তেল পরিবাহিত হয়। এই রুটটি যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। দুবাইয়ের মতো একটি নিরাপদ বন্দরে হামলা হওয়া মানে হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির আওতায় এখন পুরো আরব উপদ্বীপ।
কুয়েত সরকার এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। অন্যদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে একে ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল যে, তাদের ওপর কোনো আঘাত এলে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে দ্বিধা করবে না। সোমবারের ঘটনা সেই হুঁশিয়ারিরই বাস্তব প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন পরিস্থিতির পরবর্তী মোড় কোন দিকে যায়, সেদিকে সতর্ক নজর রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধের এই দাবানল যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে ২০২৬ সালটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক অন্ধকারতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
দুবাই বন্দরের সেই জ্বলন্ত জাহাজের ছবি এখন বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম। এটি কেবল একটি ট্যাংকারে হামলা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির মহড়ার এক বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ। শান্তি ও স্থিতিশীলতার আশা এখন ফিকে হয়ে আসছে, আর পারস্য উপসাগরের ঢেউয়ে আছড়ে পড়ছে যুদ্ধের গর্জন।

