মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত শহর ইস্ফাহানে এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী। সোমবার রাতের এই আকস্মিক অভিযানে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। হামলার তীব্রতা এবং এর রাজনৈতিক গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হামলার ভিডিও শেয়ার করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
ইস্ফাহান শহরটি ইরানের সামরিক এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। সোমবার গভীর রাতে যখন শহরবাসী ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই বিকট শব্দে একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়েছিল এবং কয়েক মাইল দূর থেকেও সেই কম্পন অনুভূত হয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ হামলা নয়, বরং ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গভীরে একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ হামলার ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে কাঁপছে ইস্ফাহান।” তার এই মন্তব্য এবং ভিডিও প্রকাশ করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সাধারণ কোনো সামরিক অভিযানের পর রাষ্ট্রপ্রধানদের পক্ষ থেকে এমন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সচরাচর দেখা যায় না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ইরানের প্রতি একটি কড়া সতর্কবার্তা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে এই অভিযানে অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৯০৭ কেজি ওজনের এই বোমাগুলো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম। ইস্ফাহানের যে অস্ত্রাগারটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে, সেটি আইআরজিসি-র অত্যন্ত সংরক্ষিত এলাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইস্ফাহান শুধু একটি ঐতিহাসিক শহরই নয়, এটি ইরানের পারমাণবিক গবেষণার একটি প্রধান কেন্দ্র। প্রায় ২৩ লাখ মানুষের এই শহরেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ‘বদর এয়ারবেইস’। এই বিমান ঘাঁটিটি ইরানের আকাশপথ প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামলার ফলে এই ঘাঁটির কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা থাকলেও প্রাথমিক তথ্যে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, হামলার পরপরই অস্ত্রাগারে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে তা পাশের আবাসিক এলাকাগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। পুরো শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে। এটি যেন এক মুহূর্তেই শান্ত শহরটিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বশক্তির সাথে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই যৌথ অভিযান চালানো হলো। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। সোমবারের এই হামলা সেই হুমকির বিপরীতে একটি সরাসরি সামরিক জবাব হতে পারে।
এই অভিযানের কৌশলগত দিকটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছিল। বাঙ্কার-বাস্টার বোমার ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে, মাটির গভীরে থাকা কোনো শক্তিশালী স্থাপনা বা মজুদ ধ্বংস করাই ছিল মূল লক্ষ্য। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই হামলা কেন রুখতে পারল না, তা নিয়ে এখন তেহরানের ভেতরেই বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এদিকে, তেহরান এই হামলার পর এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক কড়া প্রতিক্রিয়া না জানালেও, দেশটির অভ্যন্তরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইস্ফাহানের মতো জনবহুল শহরের কাছে এমন ভারী বোমাবর্ষণ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এনডিটিভি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মতে, এই হামলার প্রভাব পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এখন সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরান কোনো পাল্টা জবাব দেয় কি না, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইস্ফাহান শহরটি তার স্থাপত্যশৈলী এবং মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের জন্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেই নান্দনিক শহরের বুকে বারুদের এই বিস্ফোরণ বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একের পর এক বিস্ফোরণে রাতের আকাশ দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এই দৃশ্য কেবল শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং এটি একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের যৌথ অভিযান সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং অপারেশনাল সমন্বয় যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, ইস্ফাহান হামলা তার প্রমাণ। তবে এই আগ্রাসনের ফলে ইরানের জনমনে পশ্চিমাদের প্রতি ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে, যা কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করবে।
ইরানের ভেতরেও এই হামলার রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সরকারের কট্টরপন্থীরা এখন পাল্টা হামলার জন্য চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ সংঘাতের ভয়াবহতা নিয়ে চিন্তিত। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ সামলানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। তবে আইআরজিসি বরাবরই তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছে।
সামগ্রিকভাবে, ইস্ফাহানের এই হামলা কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় আঘাত নয়, বরং এটি ইরানের শাসনব্যবস্থার প্রতি একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব এখন আরও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করতে দ্বিধা করবে না। আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বনেতারা এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিন্দা বা বিবৃতি আসেনি, তবে নেপথ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফেরার বিকল্প নেই। কিন্তু ইস্ফাহানের আকাশে যে ধোঁয়া এখনও কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে, তা যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই সংকেত দিচ্ছে।

