বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরান ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে এই সমুদ্রপথে তেহরানের পেতে রাখা মাইন নিষ্ক্রিয় করতে বিশেষায়িত ‘আন্ডারওয়াটার ড্রোন’ বা পানির নিচে চলতে সক্ষম ড্রোন মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই ধমনীকে সচল রাখতেই ব্রিটিশ নৌবাহিনী এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হ্যালি গত রোববার ‘সানডে টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফেরাতে ব্রিটেন তার দুই প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির একটি বিশাল রসদবাহী জাহাজ ‘আরএফএ লিমে বে’-কে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হচ্ছে।
৫৮০ ফুট দীর্ঘ এই বিশালাকার জাহাজটি মূলত সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ বহনের কাজে ব্যবহৃত হলেও, বর্তমানে এটিকে আন্ডারওয়াটার ড্রোন পরিচালনার ‘মাদারশিপ’ বা নিয়ন্ত্রণকারী জাহাজ হিসেবে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই জাহাজ থেকেই পানির নিচে ড্রোনগুলো পরিচালনা করা হবে, যা পারস্য উপসাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা মাইনগুলো খুঁজে বের করবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, এই অভিযানে ব্যবহৃত ড্রোনগুলো সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পরিচালিত এবং স্বয়ংক্রিয়। এগুলোতে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী সেন্সর, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের গভীরে থাকা যেকোনো ধাতব বস্তু বা মাইন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। ড্রোনগুলো কেবল মাইন চিহ্নিতই করবে না, বরং সেগুলো নিরাপদে ধ্বংস করার ক্ষমতাও রাখে।
হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় ‘বিশ্বের জ্বালানি দরজা’। প্রতিদিন বিশ্ববাজারে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর অর্থনীতি এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান যখন এই পথে অবরোধ আরোপ করে, তখন থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থনকারী কোনো জাহাজ এই রুট দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। গত এক মাসে তেহরান কেবল হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এক ডজনেরও বেশি বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ।
জন হ্যালি আরও স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল ড্রোন নয়, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সুরক্ষায় হরমুজ ও আরব সাগরে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর এই তৎপরতা মূলত ইরানের নৌ-অবরোধ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি মরিয়া চেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, পানির নিচে এই ড্রোন যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও জটিল মোড়ে নিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইরান যখন মাইন ও গেরিলা নৌ-কৌশল ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বকে চাপে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ব্রিটেন ও তার মিত্ররা প্রযুক্তির জোরে সেই প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালির এই ‘মাইন গেম’ শেষ পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার নৌ-যুদ্ধে রূপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

