ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান সরকার কেবল ‘জুলাই সনদ’ নয়, তাদের নিজেদের ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচি থেকেও বিচ্যুত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তাঁর মতে, সরকারের প্রাথমিক কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কার্যত পুরোনো সেই ‘দলীয়করণ’ নীতির পথেই হাঁটছে।
আজ রোববার (২৯ মার্চ) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও দৈনিক সমকালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। মজিবুর রহমান মঞ্জু বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের কড়া সমালোচনা করে সতর্ক করে দেন যে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে তা ভঙ্গ করলে জনরোষ তৈরি হতে পারে।
৩১ দফার লঙ্ঘন ও জ্বালানি খাতের ‘কালাকানুন’
বৈঠকে আলোচনার এক পর্যায়ে বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির ১৭ নম্বর দফাটি পাঠ করে শোনান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি উল্লেখ করেন, ওই দফায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব ‘কালাকানুন’ বাতিল করা হবে এবং রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্নীতি কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে।
মঞ্জু অভিযোগ তুলে বলেন, “বাস্তবে আমরা দেখছি সরকার তাদের ৩১ দফার ১, ৮ ও ৯ নম্বর দফার প্রাথমিক শর্তগুলোও রক্ষা করেনি। কুইক রেন্টালের দায়মুক্তি আইনের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো এখনো বহাল থাকা প্রমাণ করে যে, সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতা সুসংহত করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ‘লুটপাট’
জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতার অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই বাড়তি সক্ষমতার প্রয়োজন না থাকলেও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যাঁরা বড় বড় ঋণখেলাপি এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হয়ে আইনপ্রণেতা হয়েছেন, তাঁরা কীভাবে এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট থেকে দেশকে উদ্ধার করবেন? শর্ষের ভেতরেই তো ভূত লুকিয়ে আছে।”
‘ছায়া সংসদ’ গঠনের আল্টিমেটাম
সংসদীয় কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন জানিয়ে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বর্তমান সংসদ যদি জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে অতীতের মতো কেবল অহেতুক রাজনৈতিক বিতর্কে সময় নষ্ট করে, তবে তাঁরা বিকল্প পথ বেছে নেবেন।
তিনি কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা যারা এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিপুল সংখ্যক নাগরিকের সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়েছি, তারা একটি শক্তিশালী ‘ছায়া সংসদ’ তৈরি করতে বাধ্য হব। রাজপথ থেকেই আমরা সরকারের প্রতিটি অন্যায়ের জবাব দেব।”
জনসচেতনতার আহ্বান
বৈঠকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এছাড়া নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ বিভিন্ন বাম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু ক্যাব প্রতিনিধিদের উদ্দেশে পরামর্শ দেন যে, কেবল বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিবিদদের নিয়ে বৈঠক করলেই হবে না। সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা চালাতে হবে। বিদ্যুৎ বিলের নামে জনগণের পকেট কাটার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

