মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদ আর আগুনের গোলকায় ঢাকা, তখন যুদ্ধের বিষাক্ত থাবা এবার আছড়ে পড়ল সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে। ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ৩০তম দিনে তেহরানে অবস্থিত কাতারি সংবাদমাধ্যম ‘আল আরাবি’র ব্যুরো অফিসে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। আজ রোববার (২৯ মার্চ) বিকেলে এই নজিরবিহীন হামলার খবর নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারকারী সংস্থাটি।
গত এক মাস ধরে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানে বহু বেসামরিক স্থাপনা ধূলিসাৎ হয়েছে। এবারের হামলায় সরাসরি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু করায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত সংবাদকক্ষ
আল আরাবি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানে অবস্থিত তাদের প্রধান কার্যালয়ে সরাসরি একটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ভবনের ভেতরে থাকা সম্প্রচার সরঞ্জামগুলো মুহূর্তেই অকেজো হয়ে পড়ে। এর ফলে চ্যানেলটি তাদের সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ টেলিকাস্ট) বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
টেলিভিশনটির প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, স্টুডিওর ভেতরে কাঁচের টুকরো, ইট-পাথর এবং দামি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে। ভবনের বাইরে রাস্তার ছবিগুলোতে ধ্বংসস্তূপের স্তূপ দেখা গেছে, যা দেখে বোঝা যায় যে ক্ষেপণাস্ত্রটি ভবনের একটি বড় অংশ ধসিয়ে দিয়েছে।
হতাহত ও উদ্ধার অভিযান
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আল আরাবি দপ্তরে এই হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। আহতদের দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার সময় কার্যালয়ের ভেতরে কতজন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী অবস্থান করছিলেন, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পার্শ্ববর্তী ভবনগুলোও এই হামলার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং চারদিকে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। উদ্ধারকারীরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকা পড়ে আছে কি না, তা খুঁজে দেখছেন।
৩০ দিনের আগ্রাসন ও মানবিক বিপর্যয়
গত এক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব জোট ইরানের ওপর যে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তার খতিয়ান বেশ দীর্ঘ। সরকারি তথ্যমতে, এই ৩০ দিনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে দুই সহস্রাধিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই সাধারণ বেসামরিক মানুষ। স্কুল, হাসপাতাল এবং এবার গণমাধ্যম কার্যালয়—সবই এখন যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারি গণমাধ্যম আল আরাবিকে টার্গেট করার মাধ্যমে ইসরাইল সম্ভবত যুদ্ধের মাঠ থেকে নিরপেক্ষ তথ্য প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। কারণ আল আরাবি যুদ্ধের শুরু থেকেই তেহরান থেকে সরাসরি সংবাদ প্রচার করে আসছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শঙ্কা
গণমাধ্যমের ওপর এই হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ‘মিডল ইস্ট আই’ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান সংকটে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
তেহরানে আল আরাবি’র কার্যালয়ে এই হামলা কাতার ও ইসরাইলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে তিক্ততা যোগ করতে পারে। ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সর্বাত্মক যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি ও গণমাধ্যমের দপ্তরে পৌঁছে গেছে, যা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

