মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের উত্তাপ ছাপিয়ে এবার সরাসরি সংঘাতের খবর এলো। সৌদি আরবের মাটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর অত্যন্ত দুর্লভ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশেষ নজরদারি বিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ নিশ্চিত করেছে যে, গত শুক্রবার সৌদির প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। পেন্টাগনের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ধ্বংস হওয়া বিমানটি সাধারণ কোনো যুদ্ধবিমান নয়; এটি ছিল আকাশপথে আগাম সতর্কতা সংকেত প্রদান এবং যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি।
লক্ষ্যবস্তু যখন ‘আকাশের চোখ’
হামলার শিকার বিমানটি ছিল ‘বোয়িং ই-৩ সেনট্রি’ (E-3 Sentry) মডেলের। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আওয়াকস’ (AWACS), যা মূলত আকাশের ওপর থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের শত্রু বিমান বা মিসাইল শনাক্ত করতে সক্ষম। উন্নত রাডার প্রযুক্তিতে ঠাসা এই বিমানটি মার্কিন কমান্ডারদের যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক ও নিখুঁত চিত্র সরবরাহ করত।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নতুন কিছু ফুটেজে দেখা গেছে, শক্তিশালী বিস্ফোরণে বিমানটি প্রায় দুমড়ে-মুচড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জানা গেছে, এই মডেলের সচল বিমান যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে মাত্র ১৬টি অবশিষ্ট ছিল। কয়েক দশক আগে এই সংখ্যা ৩০-এর উপরে থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও বয়সের কারণে এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছিল। ফলে একটি বিমান হারানো মানে মার্কিন বিমানবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরা।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে চালানো এই আকস্মিক হামলায় কেবল বিশেষ বিমানটিই নয়, আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কয়েকজন আরব কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল কৌশলগত সম্পদগুলো। ই-৩ সেনট্রি বিমানের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত কয়েকটি ‘রিফুয়েলিং’ বিমানও এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর দীর্ঘক্ষণ আকাশে ওড়ার সক্ষমতা সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
৭০০ মিলিয়ন ডলারের সংকট
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ই-৩ সেনট্রি বিমান ধ্বংস হওয়া মানে কেবল একটি যন্ত্র হারানো নয়, বরং কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির বিনাশ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই বিমানগুলো সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
যদি পেন্টাগন এই শূন্যস্থান পূরণ করতে চায়, তবে তাদের কয়েক গুণ বেশি দামি ‘ই-৭ ওয়েজটেইল’ (E-7 Wedgetail) বিমান মোতায়েন করতে হবে। একেকটি ই-৭ বিমানের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় এই বিশাল অংকের ক্ষতি সামাল দেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের মেঘ
টাইমস্ অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ড্রোন এবং নিখুঁত নিশানার মিসাইলের সমন্বয়ে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সরাসরি সৌদি আরবের ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা এখন আর কেবল প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই হামলার প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় ধরনের কোনো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর এখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই বিমান ধ্বংসের ঘটনাটি কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নয়, বরং বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

