মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছে, তখন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এক অভাবনীয় ও বিতর্কিত শর্ত সামনে এনেছে তেহরান। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান এখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সাথে যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দাবি করছে। তবে কেবল স্বীকৃতিই নয়, এই কৌশলগত জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলো থেকে নিয়মিত টোল বা মাশুল আদায়ের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে দেশটি।
তেহরানের এই আকস্মিক পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এই জলপথকে একটি লাভজনক আয়ের উৎসে পরিণত করতে চাইছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে বছরে কয়েকশ কোটি ডলার আয় হতে পারে ইরানের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।
জ্বালানি বাণিজ্যের হৃদপিণ্ড ও ইরানের কৌশল
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সরু জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছায়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি এতটাই সংকীর্ণ যে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা মানেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নাটাই হাতে রাখা।
ইরান ঐতিহাসিকভাবেই এই প্রণালিকে তাদের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। অতীতে বহুবার পশ্চিমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তারা এই পথ বন্ধের হুমকি দিয়েছে। তবে এবারকার কৌশলটি ভিন্ন। তারা এখন কেবল হুমকি নয়, বরং একে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘রাজস্ব অঞ্চল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরান ঠিক এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের শর্তে আনতে চাইছে।
“বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা সহজ”
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বিষয়টিকে ইরানের একটি অত্যন্ত সুচতুর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “তেহরান সম্ভবত এখন এটা বুঝতে পেরেছে যে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা আসলে কতটা সহজ এবং সস্তা। তারা দেখছে যে সামরিক শক্তির চেয়েও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বকে চাপে রাখা অনেক বেশি কার্যকর।”
দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, ইরান এখন তাদের সামরিক আধিপত্যকে সরাসরি নগদায়ন করতে চাইছে। আয়ের নতুন উৎস খুঁজে বের করার মাধ্যমে তারা মূলত পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ায় যদি তারা সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান কয়েক গুণ শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
ওয়াশিংটনের কড়া হুঁশিয়ারি
ইরানের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার খবরে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘অবৈধ এবং বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটন মনে করছে, আন্তর্জাতিক জলপথে এ ধরনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বৈশ্বিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক পানিসীমায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের এমন খবরদারি বা টোল আদায়ের দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল একটি বেআইনি দাবিই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ইরানের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই হুমকি মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
নতুন নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যুটি এখন প্রধান আলোচনার বিষয়। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া ভাষণেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, কোনো চাপ বা নিষেধাজ্ঞার কাছে নতিস্বীকার করবে না তেহরান।
খামেনি তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি অবরোধ বা নিয়ন্ত্রণের যে ঐতিহাসিক সুযোগ ইরানের সামনে এসেছে, তা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা হবে না। তাঁর এই কঠোর অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বও এখন এই জলপথকে দরকষাকষির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে একমত।
সুয়েজ খালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে আয়
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের করা হিসাব-নিকাশ কিন্তু ইরানের এই দাবির পেছনে বিশাল অংকের অর্থের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিএনএনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ বড় তেলবাহী ট্যাংকার যাতায়াত করে, তার প্রতিটি থেকে যদি ২০ লাখ ডলার করে ফি আদায় করা হয়, তবে ইরানের মাসিক আয় দাঁড়াবে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের বেশি।
বাৎসরিক হিসেবে এই অর্থের পরিমাণ দশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ইরান সত্যিই এই টোল ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে, তবে তাদের এই আয় মিশরের সুয়েজ খাল থেকে আসা রাজস্বকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুয়েজ খাল দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক জলপথ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানির গুরুত্ব বিবেচনায় ইরানের আয় অনেক বেশি হতে পারে।
আইনি লড়াই ও পর্দার আড়ালের গুঞ্জন
তবে ইরানের এই দাবি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কতটা বৈধ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাসকা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মুক্ত সাগরে বা আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশের এককভাবে টোল আদায়ের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। ‘আনক্লস’ (UNCLOS) বা সমুদ্র আইন বিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলোতে সব দেশের জাহাজের ‘নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের’ অধিকার রয়েছে।
ক্রাসকা বলেন, “ইরান যদি আইন পরিবর্তন করতে চায় বা জোরপূর্বক অর্থ আদায় করতে চায়, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।” কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচের বাইরেও সমুদ্রের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কিছু বলছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুঞ্জন উঠেছে যে, কিছু বড় জাহাজ কোম্পানি তাদের পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে ইরানকে গোপনে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করছে। যদিও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি, তবে এমন গুঞ্জন চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
অনিশ্চয়তায় বিশ্ব বাণিজ্য
ইরানের এই নতুন দাবি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ, অন্যদিকে ইরানের অর্থনৈতিক চাল—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ জাহাজ কোম্পানি ও বিশ্ব অর্থনীতি। যদি কোনো সমঝোতা না হয় এবং ইরান সত্যি সত্যিই হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি শুরু করে, তবে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইরান কি তাদের এই শর্তে বিশ্বকে রাজি করাতে পারবে? নাকি এটি কেবল যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি ফাঁকা বুলি? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত যে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই দাবার চাল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

