আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে বন্ধুত্বের ভাষা যখন আধিপত্যের দম্ভে রূপ নেয়, তখন শিষ্টাচারের সীমা যে কতটা নিচে নামতে পারে, তার প্রমাণ দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সৌদি আরবের দীর্ঘকালীন মিত্রতা এবং দেশটির বয়োবৃদ্ধ বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজকে নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের যে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে, তাতে সৌদি আরব এখন আক্ষরিক অর্থেই তার ‘অনুগত’ হতে বাধ্য।
স্থানীয় সময় শুক্রবার ফ্লোরিডার মিয়ামিতে এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প তার চিরাচরিত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সৌদি রাজপরিবারকে আক্রমণ করেন। তিনি কেবল রাজনৈতিক প্রভাবের কথাই বলেননি, বরং বাদশাহ সালমানকে নিয়ে এমন কিছু অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন যা সাধারণত দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে অকল্পনীয়। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশটিকে এখন কেবল ওয়াশিংটনের এক আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে চান।
‘পারিবারিক আপ্যায়ন বনাম দাপুটে আধিপত্য’
ট্রাম্প তার ভাষণে বিগত সৌদি সফরের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, বাদশাহ সালমান তাকে অভূতপূর্ব সম্মান দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বাদশাহ সালমান তাকে সঙ্গ দিতে গিয়ে নিজের আসন থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন—যা এর আগে অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা বিশ্বনেতার ক্ষেত্রে তিনি করেননি।
তবে এই আতিথেয়তাকে ট্রাম্প সৌদির ‘দুর্বলতা’ হিসেবেই দেখছেন। তিনি দাবি করেন, সৌদি আরবের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি ক্ষমতায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল একটি ‘মৃত দেশ’। কিন্তু বর্তমানে তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই শক্তি প্রদর্শনের এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন রূপক ব্যবহার করে বলেন যে, সৌদি বাদশাহ হয়তো কখনো ভাবেননি তাকে ট্রাম্পের ‘অনুগত’ বা পদলেহন করতে হবে।
অনুগত হওয়া ছাড়া উপায় নেই?
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল সুর ছিল সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশটির অতিনির্ভরশীলতা। তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সৌদির সামনে এখন আর অন্য কোনো বিকল্প বা সুযোগ নেই। বর্তমানে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের যে অস্থির পরিস্থিতি, তাতে টিকে থাকতে হলে রিয়াদকে অবশ্যই তার প্রতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পুরোপুরি অনুগত থাকতে হবে।
তার ভাষায়, “তাদের কাছে এখন আর কোনো চয়েস নেই। ফলে আমার প্রতি অনুগত হওয়াটাই তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।” ট্রাম্পের এই ‘মাসকুলার ডিপ্লোম্যাসি’ বা পেশিশক্তির কূটনীতি মূলত সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড়
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে এবং কূটনৈতিক মহলে বাদশাহ সালমানের মতো একজন প্রবীণ ও সম্মানিত নেতার প্রতি এমন অবমাননাকর শব্দ ব্যবহারের কড়া নিন্দা জানানো হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্য দীর্ঘদিনের মার্কিন-সৌদি কৌশলগত সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করতে পারে।
অন্যদিকে, রিয়াদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও, কূটনৈতিক অন্দরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। ট্রাম্পের এই ধরনের লাগামহীন বক্তব্য কেবল সৌদি আরব নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।
এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ভাষণ এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের দামামা বাজছে। এই সংকটকালে মিত্রদের আশ্বস্ত করার বদলে তাদের অপমান করা ট্রাম্পের এক বিশেষ কৌশল হতে পারে—যাতে তিনি বোঝাতে চান যে, রক্ষাকর্তা হিসেবে আমেরিকার হাত ছাড়া রিয়াদের আর কোনো গতি নেই। তবে এই দম্ভ শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য হিতে বিপরীত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

