বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাই কি বদলে দিতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিকের ওপার পর্যন্ত এখন কেবল একটিই প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের ছেড়ে একা চলার পথে হাঁটছে? শুক্রবার এক বিস্ফোরক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের কড়া সমালোচনা করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট বা ন্যাটো (NATO)-তে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার এই সন্ধিক্ষণে ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘নিস্পৃহ’ ভূমিকা ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। তার মতে, সংকটের সময় যারা পাশে থাকে না, তাদের নিরাপত্তার ভার বয়ে বেড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবলই অর্থের অপচয়। ট্রাম্পের এই অবস্থান আটলান্টিক পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।
বিলিয়ন ডলারের বোঝা ও প্রতিদানের প্রশ্ন
নিজের বক্তৃতায় ট্রাম্প অত্যন্ত রূঢ়ভাবে পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর কয়েকশ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটন এই বিশাল আর্থিক বোঝা বহন করলেও, বিনিময়ে মিত্রদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থাকে তিনি ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই মিত্রদের পাশে থেকেছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রতিদান কোথায়? ন্যাটোর রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, তা সাশ্রয় করলে আমেরিকার অনেক লাভ হবে। আমরা তাদের রক্ষা করি, অথচ দরকারের সময় তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাহলে আমাদের আর তাদের পাশে থাকার প্রয়োজন আছে কি?” এই সোজাসাপ্টা প্রশ্ন তুলে ট্রাম্প কার্যত ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি ও ‘আনুগত্যের পরীক্ষা’
ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের এই ক্ষোভ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর আগে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত রাখতে মিত্র দেশগুলোকে নিজ নিজ যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। ট্রাম্প বিষয়টিকে মিত্রদের জন্য একটি ‘আনুগত্যের পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তার মতে, যেসব দেশ নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই সংকটকালে দু-একটি নৌযান পাঠানো ছিল অত্যন্ত ‘সামান্য প্রচেষ্টা’। কিন্তু অধিকাংশ মিত্র দেশই সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ভয়ে বা কূটনৈতিক জটিলতার কারণে এই আহ্বানে সাড়া দিতে গড়িমসি করেছে। আর এটাই ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।
‘গিভ অ্যান্ড টেক’ নীতিতে হোয়াইট হাউস
ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা ব্যবসায়িক ‘লেনদেন’ বা ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “তারা যদি আমাদের পাশে না থাকে, তবে আমরা কেন তাদের পাশে থাকব?” তার এই একরোখা মনোভাব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমেরিকার সামরিক ছাতা এখন আর বিনামূল্যে পাওয়া যাবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই অবস্থান মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোকে চাপে ফেলে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে বাধ্য করার একটি কৌশল হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র তার অপ্রয়োজনীয় আর্থিক খাতগুলো ছেঁটে ফেলতে চাইছে।
অনিশ্চয়তায় বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা
যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যি সত্যিই ন্যাটো থেকে তার ব্যয় কমিয়ে দেয় বা জোট থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আপাতত হোয়াইট হাউসের বার্তা পরিষ্কার—আমেরিকা আর একতরফা ত্যাগের পথে হাঁটবে না। মিত্রদের যদি মার্কিন সুরক্ষা বলয়ে থাকতে হয়, তবে তাদের হয় অর্থ দিয়ে না হয় রণক্ষেত্রে সরাসরি সমর্থন দিয়ে তার প্রমাণ দিতে হবে। ট্রাম্পের এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আগামী দিনে বৈশ্বিক সামরিক জোটে কী ধরনের ফাটল ধরায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

