আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আকাশপথে ক্রমবর্ধমান হুমকির মোকাবিলায় রাশিয়ার অত্যাধুনিক এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরই পুনরায় আস্থা রাখল ভারত। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার সবুজ সংকেত দিয়েছে প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিষদ (ডিএসি)।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই মেগা চুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়। ভারতের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে নানামুখী সমীকরণ কাজ করছে। তবে পুরোনো মিত্র রাশিয়ার ওপর ভরসা রেখেই ভারত তার আকাশসীমাকে ‘লৌহবর্ম’ দিয়ে ঢাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২.৩৮ লাখ কোটি রুপির বিশাল বাজেট
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ে ভারত সরকার ২.৩৮ লাখ কোটি রুপির একটি বিশাল বাজেট বরাদ্দ করেছে। যদিও ঠিক কত সংখ্যক এস-৪০০ ইউনিট কেনা হবে, সে বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কৌশলগত কারণে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এস-৪০০ সিস্টেমটি মূলত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সীমান্ত এলাকায় শত্রুপক্ষের দীর্ঘ পাল্লার বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি মোতায়েনের ফলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
পুরানো সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ব্যবহারের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। ২০১৮ সালে নয়াদিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে ৫টি এস-৪০০ ইউনিট কেনার জন্য ৫.৪৩ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তির অধীনে ইতিমধ্যে তিনটি ইউনিট ভারতের হাতে পৌঁছেছে এবং বাকি দুটি ইউনিট চলতি বছরের মধ্যেই সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত এই নতুন ক্রয়ের অনুমোদন প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তির ওপর ভারতীয় বিমানবাহিনী কতটা সন্তুষ্ট। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নানা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়। এই পদক্ষেপটি রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কের স্থায়িত্বকেই পুনর্ব্যক্ত করে।
প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সেনাপ্রধান এবং প্রতিরক্ষা সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এখন শুরু হবে দর নির্ধারণ এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের কাজ। ভারতের এই বিশাল বিনিয়োগ মূলত দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি শত্রুর ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই ধ্বংস করার সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বার্তা মূলত পাকিস্তান ও চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি পরিষ্কার সঙ্কেত। বিশেষ করে যখন লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা লেগেই থাকে, তখন এস-৪০০ এর মতো ব্যবস্থা ভারতকে যুদ্ধের ময়দানে বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সুবিধা প্রদান করবে।
নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৪০০ কিলোমিটার দূর থেকেই শত্রুর লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। ভারতের বিশাল সীমান্ত পাহারায় এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র মাঝেমধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বিষয়ে ভারতকে সতর্ক করে থাকে, তবে নয়াদিল্লি বারবারই প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল বাজেটের নতুন এস-৪০০ বহর ভারতের মাটিতে পৌঁছাতে কত সময় লাগে। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, ২.৩৮ লাখ কোটি রুপির এই বিনিয়োগ ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে অনেকখানি এগিয়ে দেবে।

