হিমালয়কন্যা নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো। প্রথাগত রাজনীতির দেয়াল ভেঙে, তারুণ্যের জয়গান গেয়ে দেশটির ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। শুক্রবার দুপুরে কাঠমান্ডুর শীতল নিবাসে (রাষ্ট্রপতি ভবন) এক জমকালো অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল তাকে পদের শপথ পাঠ করান।
শপথ অনুষ্ঠানের দৃশ্যটিও ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। প্রথাগত রাজনৈতিক পোশাকের বদলে বালেন্দ্র শাহর পরনে ছিল তার চিরচেনা আঁটসাঁট ট্রাউজার্স ও জ্যাকেট। মাথায় ঐতিহ্যবাহী কালো নেপালি টুপি আর চোখে ডার্ক সানগ্লাস—তার এই স্বতন্ত্র স্টাইলই জানান দিচ্ছিল যে, নেপালের শাসনভার এখন এক নতুন প্রজন্মের হাতে। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল।
বালেন্দ্র শাহর এই উত্থান নেপালের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র্যাপার হিসেবে পরিচিত বালেন্দ্র গত কয়েক বছরে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে নিজের প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে তার এবারের জয়যাত্রা ছিল আরও বিশাল। গত ৫ মার্চের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) ২৭৫ আসনের সংসদে ১৮২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
দুর্নীতিবিরোধী ‘জেন-জি’ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের পিঠে চড়ে বালেন্দ্রর এই ক্ষমতায় আসা নেপালের সাধারণ মানুষের মনে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্লান্ত নেপালিদের কাছে তিনি এখন এক ত্রাতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তিনিই অন্যতম কনিষ্ঠ এবং মাধেসি নৃগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যা দেশটির জাতিগত রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন।
তবে সিংহাসনে বসা মাত্রই বালেন্দ্র শাহর সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি উপড়ে ফেলা এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরানোই হবে তার সরকারের প্রধান পরীক্ষা। এছাড়া আন্দোলনের সময়কার সহিংসতার স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং জনমনে আস্থার প্রতিফলন ঘটানোও তার জন্য সহজ হবে না। তিন কোটি মানুষের এই দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বালেন্দ্রর ওপর সবার নজর থাকবে। ভারত ও চীনের মতো দুই প্রতিবেশী পরাশক্তির মাঝে নেপালের ভারসাম্য বজায় রাখা সবসময়ই একটি কঠিন কাজ। ১৯৯০ সালের পর থেকে নেপালে কোনো সরকারই তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। সেই ভঙ্গুর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে বালেন্দ্র শাহ কতটা স্থিতিশীলতা দিতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় যখন প্রবীণ রাজনীতিকদের দাপট, তখন বালেন্দ্র শাহর এই অভিষেক এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। তার হাত ধরে নেপাল কি এক আধুনিক, স্বচ্ছ ও কর্মচঞ্চল রাষ্ট্রে পরিণত হবে? কাঠমান্ডুর রাজপথে আজ এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে আপাতত নেপালিদের বিশ্বাস—যে হাত মাইক্রোফোন ধরে তারুণ্যের দ্রোহ ফুটিয়ে তুলত, সেই হাতই এবার শক্তভাবে ধরবে হিমালয়ের এই দেশটির হাল।

